চুক্তি থাকলেও গ্রিসে যেতে পারছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা

চুক্তি থাকলেও গ্রিসে যেতে পারছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা

 


গ্রিসে কাজের সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত দেশটিতে যেতে পারছেন না অনেক বাংলাদেশি কর্মী। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পরও ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতায় আটকে যাচ্ছে তাঁদের বিদেশযাত্রা। বিশেষ করে গ্রিসের ভিসা সাক্ষাৎকার দিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং ভারতীয় ভিসা পেতে সমস্যার কারণে অনেকের চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতির শিকার ইমন মিয়া। গ্রিসের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়ার পর নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিটও পেয়েছিলেন তিনি। সব প্রস্তুতি শেষ করে শুধু ভিসার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সাক্ষাৎকারের জন্য দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন হলেও ভারতীয় ভিসা না পাওয়ায় তাঁর আর গ্রিসে যাওয়া হয়নি।

ইমনের মতো আরও অনেক কর্মী একই ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে গ্রিসে কৃষি, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ থাকলেও ভিসা প্রক্রিয়ার বাধায় সেই চাহিদার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

চাহিদা বাড়ছে অন্য দেশের কর্মীদের

গ্রিক সূত্রের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফিলিপাইন থেকে কর্মী পুনর্নিয়োগের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৬৪৩। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৭৯-এ। একই সময়ে ভারত থেকে কর্মী পুনর্নিয়োগের সংখ্যা ৭ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৯৪৭। নেপাল থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী নিচ্ছে গ্রিস।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগের সমঝোতা থাকলেও বাস্তবে কর্মী পাঠানোর হার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৮ হাজার কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকলেও বৈধ পথে গ্রিসে গেছেন ৫০০ জনেরও কম বাংলাদেশি।

দিল্লিনির্ভর ভিসা প্রক্রিয়াই বড় বাধা

বাংলাদেশে গ্রিসের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস না থাকায় দেশটির ভিসার জন্য আবেদনকারীদের নয়াদিল্লির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ, দিল্লিতে যাতায়াত এবং নির্ধারিত সময়ে সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে বাড়তি জটিলতা।

এই প্রক্রিয়ায় দেরি হলে নিয়োগকর্তার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তখন অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি কর্মীর পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ করছে। এতে একদিকে চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মীরা, অন্যদিকে গ্রিসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। কৃষি খামার থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর মালিকেরা নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীরা কাজেও দক্ষ; কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রদূত জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় প্রতি মাসেই গ্রিসের পররাষ্ট্র ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে নিয়মিত কনস্যুলার টিম পাঠানো অথবা অন্য কোনো দেশের গ্রিক দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদনের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

শ্রমচুক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর দাবি

২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, প্রতিবছর সর্বোচ্চ চার হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়ার বাধা দূর না হওয়ায় চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সুযোগের তুলনায় অনেক কম কর্মী গ্রিসে যেতে পারছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশে নিয়মিত গ্রিক কনস্যুলার কার্যক্রম চালু করা, বিকল্প দেশে ভিসার আবেদন ও সাক্ষাৎকারের সুযোগ তৈরি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

গ্রিসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য থাকা সুযোগ ধরে রাখতে দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে ভবিষ্যতে আরও বেশি নিয়োগ অন্য দেশগুলোর দিকে চলে যেতে পারে। তাই শুধু শ্রমচুক্তি স্বাক্ষর নয়, কর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও সহজ ভিসা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ


0 Response to "চুক্তি থাকলেও গ্রিসে যেতে পারছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন