জলবায়ু রক্ষায় এআই ব্যবহারের অঙ্গীকার, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

জলবায়ু রক্ষায় এআই ব্যবহারের অঙ্গীকার, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়


 জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে কপ৩১-এর আয়োজক তুরস্কের সভাপতিত্ব কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে প্রকাশ করা হয়েছে ‘আনতালিয়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্লেজ’। এতে জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২৭ অক্টোবর অঙ্গীকারটি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন কপ৩১। এই সম্মেলনকে সামনে রেখে এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

কপ৩১ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) যৌথভাবে অঙ্গীকারটি তৈরিতে কাজ করেছে। এতে এআই কীভাবে তৈরি, সংগ্রহ, পরিচালনা, ব্যবহার ও মূল্যায়ন করা হবে, সেসব ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এআইয়ের সম্ভাবনা ও পরিবেশগত ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই বিভিন্নভাবে সহায়ক হতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির উন্নয়নে এআইয়ের ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে পরিবেশগত পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হতে পারে।

তবে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাবও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থার চাহিদা বাড়ছে। এসব অবকাঠামো চালাতে বিপুল বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের ওপর নির্ভর করে এআইয়ের বিস্তার কার্বন নিঃসরণ ও পানির ব্যবহার বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ কারণে শুধু এআইয়ের মাধ্যমে জলবায়ু সমস্যার সমাধান খোঁজাই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিটি পরিচালনার সময় কতটা বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার হচ্ছে, সেই সম্পদের উৎস কী এবং পরিবেশের ওপর সামগ্রিক প্রভাব কতটা—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

স্বেচ্ছামূলক অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন

নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এটি বাধ্যতামূলক কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়; বরং স্বেচ্ছায় সমর্থন ও প্রতিশ্রুতি দেওয়ার একটি কাঠামো। ফলে অংশগ্রহণকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আনতালিয়া এআই প্লেজ জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি—দুই দিকই সামনে এনেছে। তবে অঙ্গীকারে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেই বলে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন।

ডব্লিউআরআইয়ের মতে, এআই অবকাঠামোর বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআইকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা, জ্বালানি ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা না গেলে ঘোষণাটি প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে

0 Response to "জলবায়ু রক্ষায় এআই ব্যবহারের অঙ্গীকার, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন