রাশিয়ার ডিজেল আমদানি নিয়ে বিতর্কে অনড় ট্রাম্প, ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ

রাশিয়ার ডিজেল আমদানি নিয়ে বিতর্কে অনড় ট্রাম্প, ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ


 যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক বাড়লেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। বরং মার্কিন জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।

সোমবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনতে ২৫ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি লেখেন, মার্কিন জনগণের জন্য তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁর নীতি সব সময়ই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি কেনার জন্য উল্লেখ করা ২৫০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি কোন সময়সীমার, তা স্পষ্ট করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় করেছে, তা নিয়ে একটি গবেষণা সংস্থার হিসাবের সঙ্গে ট্রাম্পের উল্লেখ করা অঙ্কের মোটামুটি মিল রয়েছে বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ।

পুতিনের সঙ্গে চুক্তিতে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে রাশিয়া থেকে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করা হবে। পরবর্তী মাসগুলোতে আরও কয়েক দফায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আসার কথা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো গেলে বাজারের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা মিলতে পারে। বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহ খাতে ডিজেলের দাম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ উদ্যোগকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকেরা এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সরবরাহের পরিমাণ, পরিবহনব্যবস্থা এবং রাশিয়ার নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে চুক্তিটির বাস্তব প্রভাব।

সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান সিনেটরদের

ট্রাম্পের ঘোষণার পর তাঁর প্রশাসনের প্রতি সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের একদল সিনেটর। তাঁদের আপত্তির মূল কারণ, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার মধ্যে মস্কোর কাছ থেকে জ্বালানি কেনা হলে রাশিয়ার আয় বাড়তে পারে। সেই অর্থ দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

সিনেটরদের বক্তব্য, ২০২২ সালে কংগ্রেস রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাঁদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে রুশ ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপের কারণ কংগ্রেসকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলেও তাঁরা মনে করছেন।

সিনেটরদের অভিযোগ, প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও পরামর্শের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি। তাই তাঁরা সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তবে প্রশাসনের পদক্ষেপ আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রাসঙ্গিক আইন ও সরকারি পদক্ষেপের বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন।

জেলেনস্কির উদ্বেগ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। সপ্তাহান্তে এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি চুক্তিটিকে দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

জেলেনস্কির আশঙ্কা, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার মাধ্যমে মস্কো আর্থিক সুবিধা পেলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত রাশিয়ার নেতৃত্বকে ভুল বার্তা দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পর্কে মস্কোর ধারণায় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, তাঁর দেশকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন প্রয়োজন। কিয়েভের দৃষ্টিতে, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন

ট্রাম্পের ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের আরেকটি কারণ হলো, রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের উদ্যোগে তাঁর সাম্প্রতিক সমর্থন। কয়েক সপ্তাহ আগে সই করা একটি আইনে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তকে আগের নিষেধাজ্ঞামূলক নীতির সঙ্গে অসংগত বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা তিনি সমর্থন করেন না।

টিলিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি মোকাবিলার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার দায়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাঁর বক্তব্য, জ্বালানির বাজারে স্বস্তি আনার উদ্যোগ যেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন রিপাবলিকান নেতারা

অন্যদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হুইপ টম এমার। তাঁর মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে মার্কিন জনগণের উদ্বেগ কমাতে প্রশাসন নতুন উপায় খুঁজছে। রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ফলে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

এমার আরও বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর এই পদক্ষেপ যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগকে কতটা সহায়তা করবে এবং এর বিনিময়ে রাশিয়া কী ধরনের সুবিধা পাবে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা এখন অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর সম্ভাব্য সুবিধার বিপরীতে রাশিয়ার আয় বৃদ্ধি ও যুদ্ধের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চুক্তির বাস্তবায়ন, সরবরাহের পরিমাণ এবং জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব স্পষ্ট হলে বিতর্কটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি আরও পরিষ্কার হবে।

0 Response to "রাশিয়ার ডিজেল আমদানি নিয়ে বিতর্কে অনড় ট্রাম্প, ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন