কবরস্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ, ঘর-বেড়া ভেঙে মরদেহ দাফন করলেন গ্রামবাসী
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে কবরস্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে দাফন করতে ভোগান্তিতে পড়েন স্বজনেরা। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা একত্র হয়ে চলাচলের পথের ওপর থাকা একটি ঘর ও টিনের বেড়া ভেঙে রাস্তা তৈরি করেন। এরপর সেই পথ দিয়ে মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা হয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বাংড়া ইউনিয়নের বিলপালিমা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তির নাম আব্দুল সালাম (৬০)। তিনি ওই গ্রামের একাব্বর আলীর ছেলে।
রাস্তা না থাকায় আটকে যায় দাফন
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল সালাম শনিবার রাতে ঘাটাইল উপজেলায় অসুস্থ অবস্থায় মারা যান। পরে স্বজনেরা কোনোভাবে তাঁর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। মৃত্যুর পর দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও কবরস্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় মরদেহ সেখানে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশীদের সঙ্গে রাস্তা নিয়ে বিরোধের কারণে কবরস্থানে যাওয়ার পথ বের করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মরদেহ দাফনের জন্য সোমবার সকালে স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মৃতের স্বজনদের দাবি, রাস্তা বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে জানাজা ও দাফনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরে গ্রামবাসীর সহায়তায় চলাচলের ব্যবস্থা হলে মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা হয়।
দুই বছর ধরে রাস্তা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বিলপালিমা গ্রামের বর্তা বিল এলাকায় চলাচলের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। তাঁদের দাবি, প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো এই এলাকার চলাচলের পথ নিয়ে প্রতিবেশী একাব্বর আলীর পরিবারের সঙ্গে অন্য একটি পক্ষের বিরোধের সূত্রপাত হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে মোতাহের মাস্টার, কবির, মজিদ ও কাশেমের পক্ষের লোকজন চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে রাস্তা বন্ধের কারণ, এর মালিকানা এবং বিরোধের আইনি অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের উদ্যোগে ভেঙে তৈরি করা হয় পথ
গ্রামের মাতবর মোজাফফর হোসেন বলেন, কবরস্থানে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তার প্রয়োজন ছিল। এ কারণে প্রতিবেশীদের চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি।
মৃত আব্দুল সালামের ভাই আবু সাঈদ, যিনি একজন পুলিশ সদস্য, জানান, পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তা চাইলে সোমবার সকালে তাঁরা একত্র হন। কবরস্থানে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা থাকায় চলাচলের রাস্তা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় পথের ওপর থাকা ঘর ও টিনের বেড়া ভেঙে দেওয়া হয়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা সম্ভব হয়।
বাংড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজালালও জানান, রাস্তার মাঝখানে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল বলে মরদেহ নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে ঘরটি ভেঙে চলাচলের পথ তৈরি করেন। এরপর মরদেহ কবরস্থানে নেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ
কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম খান সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাস্তা নিয়ে বিরোধ চলার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। বিরোধের জেরে ক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন ঘর ভেঙে মরদেহ দাফন করেছেন বলে তাঁর কাছে তথ্য এসেছে।
ওসি জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
বিরোধের স্থায়ী সমাধানের দাবি
একটি মরদেহ কবরস্থানে নেওয়ার পথ তৈরি করতে ঘর ও বেড়া ভাঙার ঘটনা এলাকায় দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি সামনে এনেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
এ ধরনের বিরোধের স্থায়ী সমাধানে রাস্তার অবস্থান, ব্যবহারাধিকার ও জমির মালিকানা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা বা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে ঘর ভাঙার ঘটনায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা আইনগত অভিযোগ রয়েছে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
0 Response to "কবরস্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ, ঘর-বেড়া ভেঙে মরদেহ দাফন করলেন গ্রামবাসী"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন