আজ জাতিসংঘ দিবস: ৮১ বছরে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা
আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ ৮১ বছরে পদার্পণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সংঘাত কমানো এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। এর আগে বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর সহযোগিতা ও সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তোলে। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে জাতিসংঘের সদর দপ্তর অবস্থিত। সংস্থাটির নামকরণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস।
জাতিসংঘের কাঠামো ও কার্যক্রম
জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদ। এটি ১৫ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত—পাঁচটি স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র। স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় এই পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা হলো আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রুশ ও স্প্যানিশ। সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রমে এসব ভাষা ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘের উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর থেকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছে দেশটি।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কাজে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সাল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ২ জুন ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। গোপন ব্যালটে তিনি ৯৯টি ভোট পান। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় এবং এর সভাপতির দায়িত্ব তিনি এক বছরের জন্য পালন করছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন।
শান্তি ও সহযোগিতার অঙ্গীকার
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দিবসটি বিশ্ববাসীকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি, মানবাধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্বের নানা অঞ্চলে চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও উন্নয়নগত বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
জাতিসংঘ দিবস কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করারও উপলক্ষ। জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তোলার অঙ্গীকারই দিবসটির অন্যতম প্রধান তাৎপর্য।
0 Response to "আজ জাতিসংঘ দিবস: ৮১ বছরে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন