বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর কথা বলা কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে
বিয়ে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলামে বিয়েকে বৈধ ও পবিত্র সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নারী-পুরুষ পারিবারিক জীবন গড়ে তোলেন এবং পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা ও সম্মানের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করেন। তবে বিয়ের আগে জীবনসঙ্গী নির্বাচন, পাত্র-পাত্রীকে দেখা এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগের সীমা নিয়ে অনেকের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে বিয়ের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার পর হবু স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সঙ্গে কতটুকু কথা বলতে পারবেন, ফোনে যোগাযোগ রাখা যাবে কি না কিংবা ব্যক্তিগত আলাপচারিতার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা কী—এসব বিষয় নিয়ে প্রায়ই আলোচনা দেখা যায়।
ইসলামি আলোচনায় এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা বা বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার অর্থ বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাওয়া নয়। নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত পাত্র ও পাত্রী পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম থাকেন। তাই তাদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্ধারিত শালীনতা ও সীমারেখা মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সামর্থ্য হলে বিয়ে করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে ইসলাম
ইসলামে বিয়ের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, যাদের বিয়ের সামর্থ্য রয়েছে, তারা যেন বিয়ে করেন। কারণ, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে সহায়তা করে। আর যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, তাদের রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতসম্মত জীবনব্যবস্থা। তবে বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা মাসকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়নি। বরং উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন, দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য এবং পারিবারিক প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীকে দেখা কি জায়েজ?
বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী সম্পর্কে যথাযথভাবে জানা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি হাদিসেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীকে দেখার বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া যায়।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবেন, তখন বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে—এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখার সুযোগ থাকলে তা দেখা যেতে পারে।
জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি একজন নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা মনে গোপন রেখেছিলেন। পরে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পান, যা তাকে ওই নারীকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তোলে। এরপর তিনি তাকে বিয়ে করেন। (সুনান আবু দাউদ: ২০৮২)
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগকে অবাধ মেলামেশা বা শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম করার অনুমতি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর কথা বলা কি বৈধ?
বিয়ের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার পর অনেক পাত্র-পাত্রীর মধ্যে নিয়মিত ফোনালাপ, বার্তা আদান-প্রদান কিংবা দীর্ঘ ব্যক্তিগত কথাবার্তা শুরু হয়। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়া এবং নিকাহ সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। নিকাহের আগে পাত্র ও পাত্রী পরস্পরের গায়রে মাহরাম থাকেন।
মাদরাসাতুত তাকওয়া, ঢাকার মুফতি শায়খ ইবনুল কালাম কালবেলা-কে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কথার ধরন ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। তার ব্যাখ্যায়, অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা বা কোমল ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ভঙ্গিতে কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।
বিয়ের আগে একে অপরের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা, পারিবারিক প্রত্যাশা বোঝা কিংবা দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের কথাবার্তা যেন প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।
এ বিষয়ে বিভিন্ন আলেমের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগগত মতামতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিস্তারিত শরয়ি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বিয়ের আলোচনা চূড়ান্ত হলে অযথা দেরি না করাই ভালো
বিয়ের বিষয়ে দুই পরিবার একমত হওয়ার পর নানা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা, আর্থিক প্রস্তুতি ও অন্যান্য কারণে বিয়ে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যেতে পারে। এতে কখনো কখনো পাত্র-পাত্রী মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন।
ইসলামি পরামর্শে বিয়ের বিষয়টি যুক্তিসংগতভাবে সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপযুক্ত প্রস্তুতি থাকলে এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হলে অযথা বিলম্ব না করে বিয়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে উভয় পক্ষের জন্য বৈধ দাম্পত্য জীবন শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বিয়ের সিদ্ধান্তে উভয়ের সম্মতি, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, পারিবারিক বাস্তবতা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বিবেচনা করা জরুরি। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে বুঝেশুনে, সম্মানজনকভাবে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য কোরআনের দোয়া
বিয়ে করতে আগ্রহী অনেকেই উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রী না পাওয়া, পারিবারিক জটিলতা কিংবা নানা সামাজিক বাধার কারণে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করা, ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং বাস্তবসম্মতভাবে জীবনসঙ্গী খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
কোরআনের সুরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতে এমন একটি দোয়া রয়েছে, যেখানে আল্লাহর কাছে স্ত্রী-সন্তানদের মাধ্যমে চোখ জুড়ানো প্রশান্তি এবং মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ হওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে।
আরবি দোয়া:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
বাংলা উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউন, ওয়া জাআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখ জুড়ানো প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন। (সুরা আল-ফুরকান: ৭৪)
এই দোয়ায় শুধু বিয়ে হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এমন পরিবার পাওয়ার প্রার্থনাও রয়েছে, যেখানে জীবনসঙ্গী ও সন্তানরা প্রশান্তির কারণ হবে এবং সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার চেষ্টা করবে।
দোয়াটি নামাজের পর কিংবা অন্য যেকোনো সময়ে পড়া যায়। তবে এই আয়াতে দোয়াটি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সময় বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তাই এটিকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লেই বিয়ে নিশ্চিত হবে—এমন দাবি না করে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করাই সমীচীন।
বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নির্দেশনার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত জরুরি
বিয়ে কেবল সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের সম্পর্ক। তাই জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় ধর্মীয় মূল্যবোধ, চরিত্র, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিয়ের আগে প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলা বা একে অপরকে জানার ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখা, নিকাহের আগে শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলা এবং বিয়ের সিদ্ধান্তে উভয়ের সম্মতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উপযুক্ত জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য দোয়া করার সঙ্গে বাস্তবসম্মত উদ্যোগও নিতে হবে।
আল্লাহর কাছে কল্যাণকর জীবনসঙ্গী ও শান্তিপূর্ণ পরিবার কামনা করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণই হতে পারে সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
0 Response to "বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর কথা বলা কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন