ফিফা সভাপতির ‘গোপন’ বেতন নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া

ফিফা সভাপতির ‘গোপন’ বেতন নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া


 বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পারিশ্রমিক নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘোষিত বেতনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার তথ্য সামনে আসার পর ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিজস্ব বিধি অনুসরণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস ও দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবা বা আইআরএসে জমা দেওয়া আর্থিক নথিতে ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের তথ্য পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে FWC2026 US Inc নামের প্রতিষ্ঠানটি তাকে ১৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার দিয়েছে, যা ব্রিটিশ মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড।

অভিযোগের মূল বিষয় হলো, এই অর্থ ফিফার ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইনফান্তিনোর ঘোষিত পারিশ্রমিকের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে ফিফার সভাপতি হিসেবে তিনি মোট কত পারিশ্রমিক পেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংস্থাটির নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

বার্ষিক প্রতিবেদনে ছিল ৪২ লাখ ৭০ হাজার সুইস ফ্রাঁ

ফিফার ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইনফান্তিনোর পারিশ্রমিক হিসেবে ৪২ লাখ ৭৪ হাজার সুইস ফ্রাঁ দেখানো হয়েছিল। ওই হিসাবের মধ্যে তার মূল বেতন, বোনাস ও অন্যান্য নির্ধারিত সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নথিতে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ঘোষিত হিসাবের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, FWC2026 US Inc-এর কাছ থেকে পাওয়া অর্থের মধ্যে ৬ লাখ ২৬ হাজার ২২৯ ডলার ছিল ‘অন্যান্য প্রতিবেদনযোগ্য পারিশ্রমিক’ হিসেবে নথিভুক্ত। বাকি অর্থের শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিতে অর্থ প্রদানের তথ্য থাকা এবং ফিফার বার্ষিক প্রতিবেদনে সেই অর্থ প্রকাশ না করা—দুটি আলাদা বিষয়। এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা কী, অর্থটি কোন দায়িত্বের বিপরীতে দেওয়া হয়েছিল এবং তা ফিফার প্রকাশসংক্রান্ত বিধির আওতায় পড়ে কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ফিফার বিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক কর্মকর্তা

ফিফার গভর্নেন্স কমিটির সাবেক প্রধান মিগুয়েল মাদুরো বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দ্য টাইমস-কে তিনি বলেছেন, ফিফার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সভাপতিকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হলে এবং তা প্রকাশ করা না হলে সেটি সংস্থার নিয়মের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হতে পারে।

মাদুরোর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিফার বিধিতে সভাপতির ব্যক্তিগত পারিশ্রমিক জনসমক্ষে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই মূল সংস্থার বাইরে অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

তিনি এ বিষয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তার বক্তব্য একটি সাবেক কর্মকর্তার মতামত ও অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া। অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিষয়টি নিজে থেকেই কোনো বিধি লঙ্ঘন প্রমাণ করে না; অর্থ প্রদানের উদ্দেশ্য, প্রযোজ্য নিয়ম এবং ফিফার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।

মায়ামিতে বিলাসবহুল বাসস্থান নিয়েও আলোচনা

ইনফান্তিনোর জীবনযাপন নিয়েও এ বিতর্কের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি মায়ামির সমুদ্রতীরবর্তী একটি বিলাসবহুল বাড়িতে থাকছেন, যার ভাড়া মাসে কয়েক হাজার ডলারেরও বেশি।

অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের তথ্য সামনে আসার পর ওই বাড়ির ব্যয় এবং তার আয়ের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে অতিরিক্ত অর্থটি ওই বাড়ির ভাড়া বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের খরচে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই অর্থের উৎস ও ব্যবহার সম্পর্কে অনুমানকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

২০২৫ ও ২০২৬ সালের পারিশ্রমিক নিয়েও প্রশ্ন

প্রতিবেদন প্রকাশকারী সূত্রের বরাতে দ্য টাইমস জানিয়েছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও ইনফান্তিনো একই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি অর্থ পেয়ে থাকতে পারেন। তবে এই দুই বছরের অর্থপ্রদানের পরিমাণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট বছরের আর্থিক নথি ও আনুষ্ঠানিক হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

এই বিতর্কে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ফিফার বার্ষিক প্রতিবেদনে সব ধরনের পারিশ্রমিক প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, FWC2026 US Inc-এর অর্থ প্রদানের ভিত্তি কী ছিল এবং এ বিষয়ে ফিফার ব্যাখ্যা কী। সংস্থাটির নিজস্ব নিয়মের আলোকে স্বাধীন ও স্বচ্ছ পর্যালোচনা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করা সহজ হবে।

বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট নথি, বিধিমালা এবং ফিফার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

0 Response to "ফিফা সভাপতির ‘গোপন’ বেতন নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া "

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন