জিপিটি-৬ ও ফেবলকে টক্কর দিতে মেটার নতুন এআই মডেল, নজর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তিতে

জিপিটি-৬ ও ফেবলকে টক্কর দিতে মেটার নতুন এআই মডেল, নজর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তিতে

 


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নত মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে নতুন দুটি মডেল উন্মোচন করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ ও ‘মিউজ ওয়ান্ডার ফুল’ নামের মডেল দুটি জটিল কাজ সম্পাদন, কোড লেখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারকারীর তথ্য মনে রাখার মতো কাজে সক্ষম বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেটার প্রকাশিত পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, কয়েকটি মানদণ্ডে মডেল দুটির পারফরম্যান্স জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা ও ফেবল ৫.১-এর সঙ্গে তুলনীয়।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব নতুন মডেল দুটি প্রকাশ করে। এ উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠানটির এআই উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এত দিন মেটা তুলনামূলক হালকা, দ্রুতগতির এবং কম সময়ে উত্তর দিতে সক্ষম মডেল তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। নতুন মডেল দুটি সেই ধারার বাইরে গিয়ে আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ সামলানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

এর আগে মেটা ‘মিউজ স্পার্ক’ নামে একটি এআই মডেল প্রকাশ করেছিল। দ্রুত উত্তর দেওয়া এবং অল্প সময়ে কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা ছিল ওই মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে নতুন মিউজ ওয়ান্ডার সিরিজে জটিল নির্দেশনা অনুসরণ, একাধিক তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে কাজ করার মতো সক্ষমতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মেটার প্রকাশিত মডেল কার্ডে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পরীক্ষায় মিউজ ওয়ান্ডার ও মিউজ ওয়ান্ডার ফুলের ফলাফল ফেবল ৫.১ এবং জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রার কাছাকাছি। তবে এসব ফলাফল মূলত মেটার নিজস্ব পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাধীন গবেষক ও তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষায় মডেলগুলোর কার্যকারিতা কেমন হবে, তা এখনো আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাই প্রকাশিত ফলাফলকে চূড়ান্ত তুলনামূলক মূল্যায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

নতুন মডেলগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে সামনে আনা হয়েছে ‘অ্যাকটিভ মেমোরি’ বা সক্রিয় স্মৃতিশক্তি। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং প্রয়োজন সম্পর্কে শেখা বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে মনে রেখে পরবর্তী কাজে ব্যবহার করতে পারবে এআই সহকারী—এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো ব্যবহারকারী কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস আগে যে তথ্য দিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য কাজে লাগাতে পারবে এআই।

মেটার গবেষক কাভিয়া কোপারাপু এক ভিডিও বার্তায় জানান, ব্যবহারকারীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে মনে রাখার সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যাপক গবেষণা করা হয়েছে। মেটার দাবি, ‘মেমোরিবেঞ্চ’ পরীক্ষায় মিউজ ওয়ান্ডার ফেবল, ওপাস ও অ্যাস্ট্রার তুলনায় বেশি স্কোর করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে শেখা তথ্য ধরে রাখা এবং প্রয়োজনের সময় সেগুলো ব্যবহার করার সক্ষমতা যাচাই করতে এ ধরনের পরীক্ষা করা হয়।

তবে এআইয়ের স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারীর পছন্দ ও প্রয়োজন মনে রাখার সুবিধা যেমন ব্যক্তিগতকৃত সেবা দিতে পারে, তেমনি কোন তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, কত দিন রাখা হবে এবং ব্যবহারকারী কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন—এসব বিষয়ও এআই সহকারীর ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ব্যবহার ও মূল্য নির্ধারণেও মডেল দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মেটার মডেল এপিআইয়ের মাধ্যমে মিউজ ওয়ান্ডার ব্যবহার করতে প্রতি ১০ লাখ ইনপুট টোকেনের জন্য চার ডলার এবং প্রতি ১০ লাখ আউটপুট টোকেনের জন্য ২০ ডলার দিতে হবে। অন্যদিকে, মিউজ ওয়ান্ডার ফুল শুধু মিউজ কোডের গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই মডেলটি এপিআইয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি। মেটার এআই এজেন্টগুলোর সক্ষমতা বাড়াতেও নতুন মডেল দুটি কাজে লাগানো হবে।

মেটা জানিয়েছে, নতুন মডেল দুটি তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির প্রমিথিউস ডেটা সেন্টারে। গত বছরের আগস্টে এআই কার্যক্রম পুনর্গঠনের পর এটিই মেটার প্রথম বড় ধরনের উন্নত এআই মডেল প্রকাশের উদ্যোগ। এর মাধ্যমে উন্নত এআই প্রযুক্তি তৈরির বাজারে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় মেটা।

নতুন মডেলগুলোর কার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের পরই এ উদ্যোগের প্রকৃত অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে। তবে মেটার এই প্রকাশনা থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়ার এআই তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বুঝে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য কাজে লাগাতে সক্ষম উন্নত এআই সহকারী তৈরির দিকেও এগোচ্ছে।

0 Response to "জিপিটি-৬ ও ফেবলকে টক্কর দিতে মেটার নতুন এআই মডেল, নজর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তিতে "

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন