চীনের অর্থনীতির দিকে কেন নজর বাংলাদেশের ?

চীনের অর্থনীতির দিকে কেন নজর বাংলাদেশের ?

 

চীনের অর্থনীতির গতিপথের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক গভীর। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ফলে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে দেশটির অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীনের আমদানি-রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বিদেশে বিনিয়োগের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং আমদানি ও শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনের পণ্য আমদানি-রপ্তানির মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল। এই প্রবণতা চীনের বাজারে বিদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি নতুন বাজারের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা বহন করে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে চীনের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, মূল্য প্রতিযোগিতা, বাজারে প্রবেশের শর্ত এবং সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যেও প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশ। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় রপ্তানির এই বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পণ্যের বৈচিত্র্য ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার প্রকাশিত পরিসংখ্যানের পরই স্পষ্ট হবে।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজার, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়, দেশটির আমদানি চাহিদা, শিল্পনীতির পরিবর্তন এবং কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, সেসব বিষয়ও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ঋণঝুঁকির মূল্যায়ন ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চাপ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং পাঁচ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি খেলাপি ঋণের বিষয়টি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাড়ানো এবং নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি ৭৪২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ ধরনের লক্ষ্য অর্জনে দেশীয় সম্পদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের সফর ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও। চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একাধিক সহযোগিতার নথিতে স্বাক্ষর হয়। চীন বাংলাদেশ থেকে আরও মানসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ জানানো হয়।

এই খাতগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ শিল্পের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং সেবা খাতের বিকাশে সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, আর্থিক সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন কাজে দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।

অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্কের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুফল কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং শিল্প কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর।

বাংলাদেশি অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, গত দুই বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ কমেছে। তাঁর মতে, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকে আবারও জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। তিনি চীন ও চীনা বিনিয়োগের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের জোরালো সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কার্যকর অবকাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগের সক্ষমতা ও আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চীনের প্রবৃদ্ধি বা বিনিয়োগ বাড়লেই বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হবে, এমন নয়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন, দক্ষ জনশক্তি, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে পারস্পরিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, রপ্তানি বাজার এবং শিল্পায়নের সুযোগ। অন্যদিকে, চীনের প্রয়োজন নতুন বাজার, বৈচিত্র্যময় সরবরাহব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার। এই পারস্পরিক চাহিদাকে বাস্তব প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কে রূপ দেওয়া গেলে উভয় দেশই উপকৃত হতে পারে।

প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের অর্থনীতি হিসেবে চীন আবাসন খাতের সমন্বয়, বৈদেশিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশটির প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও শিল্প খাতের সক্ষমতা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইভাবে, বাংলাদেশের উচিত চীনের অর্থনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে নিজের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কৌশল নির্ধারণ করা।

চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের পর দেশটির প্রবৃদ্ধি, আমদানি ও শিল্প উৎপাদনের গতিপথ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু প্রবৃদ্ধির হার জানা নয়। চীন কী ধরনের পণ্য আমদানি করছে, কোন খাতে বিনিয়োগ করছে এবং কী ধরনের অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তুলছে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, বাস্তবসম্মত প্রকল্প, দক্ষ জনশক্তি এবং দুই দেশের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। কারণ, চীনের অর্থনৈতিক গতিপথের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং মানুষের জীবিকার ভবিষ্যৎ।

0 Response to "চীনের অর্থনীতির দিকে কেন নজর বাংলাদেশের ?"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন