তাজমিন হত্যা রহস্যে নতুন মোড়! কক্সবাজারে রাজুকে সাড়ে চার ঘণ্টা জেরা
কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। এবার তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে কক্সবাজারের হোটেলকর্মী রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সোমবার (১২ অক্টোবর) জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাজাহান ইলাহী নূরী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজুকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক মোহাম্মদ ইরফানুল হক চৌধুরী তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
গণমাধ্যমে নাম আসার পর আটক
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনের চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন এলাকা থেকে রাজুকে আটক করা হয়। তাজমিন হত্যা তদন্তে তার নাম আলোচনায় আসার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়।
পরদিন সোমবার সকালে কুমিল্লা ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক পবিত্র সরকার রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে লিখিত অধিযাচনপত্র পাঠান। সেই অনুরোধের ভিত্তিতে কুমিল্লা থেকে আসা ডিবির একটি দল কক্সবাজার সদর মডেল থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে চলে এই জিজ্ঞাসাবাদ।
তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাজুকে কুমিল্লায় নিয়ে যায়নি ডিবি দল। তাকে আবার কক্সবাজার পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বিকেলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, কুমিল্লা পুলিশের লিখিত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রাজুকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফেরত পাওয়ার পর তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান জানান, রাজুকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশের দল কক্সবাজারে যায়নি। বরং হোটেলে তার অবস্থান এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় যাচাই করতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা নিয়ে তদন্তে যা উঠে এসেছে
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে গত ৬ অক্টোবর কক্সবাজারে গিয়েছিল তাজমিন। সেখানে কলাতলী এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে রাজুর সঙ্গে তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর লেখা হয়েছিল। সেখানে তাদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে হোটেলের নথিতে থাকা তথ্য এবং ওই সময়ে ঠিক কী ঘটেছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে তারা হোটেল ছাড়ে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরপর রাজু তাজমিনের জন্য কুমিল্লাগামী বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন। ওই রাতে কুমিল্লায় পৌঁছানোর পর বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার সঙ্গে তাজমিনের দেখা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ধানখেতে মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যা মামলা
গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার বাবার করা হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হয়। পরে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা ডিবি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, সুমনের বিরুদ্ধে তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজুর সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে। এ কারণেই রাজুর সঙ্গে কথা বলে তার হোটেলে অবস্থান, যাতায়াত এবং তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কে ছিলেন জান্নাতুল তাজমিন?
জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। তার পরিবারের আদি নিবাস যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে। বাবা আবদুল আলিম রেনাটা পিএলসিতে চাকরি করায় পরিবারটি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত।
তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের তদন্ত চলছে, অন্যদিকে তার সঙ্গে কক্সবাজারে যাওয়া এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ করা বা আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো মানেই হত্যা মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়া নয়।
এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে অবস্থান, কুমিল্লায় ফেরার ব্যবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে তার সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না। এ বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন তথ্য না দেওয়া পর্যন্ত রাজুর ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই
0 Response to "তাজমিন হত্যা রহস্যে নতুন মোড়! কক্সবাজারে রাজুকে সাড়ে চার ঘণ্টা জেরা"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন