১২৩ বছরের জীবনের অবসান! চশমা ছাড়াই কুরআন পড়তেন আব্বাস প্রামাণিক, চলে গেলেন না ফেরার দেশে
দীর্ঘ ১২৩ বছরের জীবনের অবসান ঘটল নাটোরের গুরুদাসপুরের প্রবীণ আব্বাস প্রামাণিকের। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জীবন কাটানো এই ব্যক্তি চশমা ছাড়াই কুরআন পড়তে পারতেন বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আব্বাস প্রামাণিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর নাতি রিপন হোসেন। তিনি জানান, রোববার হঠাৎ করেই তাঁর দাদার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা খুবজিপুর প্রবীণ সেবাকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে চিকিৎসক তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেন। তবে সব চেষ্টা সত্ত্বেও সোমবার সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়।
অসুস্থতার খবর পেয়ে বাড়িতে পাঠানো হয় চিকিৎসক
খুবজিপুর প্রবীণ সেবাকেন্দ্রের ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষক আবু সাইদ সরকার জানান, আব্বাস প্রামাণিক দীর্ঘদিন ধরে ওই সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়ে আসছিলেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর পাওয়ার পর দ্রুত বাড়িতে চিকিৎসক পাঠানো হয়।
সেবাকেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সেবাকেন্দ্রটির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁর মৃত্যুতে এলাকার একজন প্রবীণ মানুষের জীবনাবসান ঘটল, যাঁর দীর্ঘ জীবন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ ছিল।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্ম ১৯০৩ সালে
জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা তথ্য অনুযায়ী, আব্বাস প্রামাণিকের জন্ম ১৯০৩ সালে। সেই হিসাব ধরে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১২৩ বছর। এ বয়সের কারণে তিনি এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখিত জন্মসাল অনুযায়ী বয়স নির্ধারণ করা হলেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা জন্মনথি বা আনুষ্ঠানিক বয়স যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তাই তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং স্থানীয়ভাবে পরিচিত অত্যন্ত প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবেই বর্ণনা করা যথাযথ।
শিক্ষকতা করতেন, শিশুদের শেখাতেন কুরআন
আব্বাস প্রামাণিকের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর শিক্ষকতা ও ধর্মীয় শিক্ষাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। কর্মজীবনে তিনি খুবজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬০ টাকা।
শিক্ষকতার পাশাপাশি এলাকার শিশুদের বিনামূল্যে কুরআন শিক্ষা দিতেন তিনি। অর্থের বিনিময়ের চেয়ে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার এই অভ্যাস তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ জীবন, শিক্ষকতা এবং কুরআন শিক্ষাদানের স্মৃতি তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।
চশমা ছাড়াই কুরআন পড়তে পারার বিষয়টিও তাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের অন্যতম কারণ ছিল। বয়সের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তাঁর এই অভ্যাসের কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত হতো।
শোক প্রকাশ উপজেলা প্রশাসনের
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ জানান, আব্বাস প্রামাণিক উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রাখা হতো। তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ইউএনও দুঃখ প্রকাশ করেন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের জীবন পেরিয়ে আব্বাস প্রামাণিকের বিদায় শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, তাঁকে চিনতেন এমন অনেক মানুষের কাছেও বেদনাদায়ক। শিক্ষকতা, শিশুদের বিনামূল্যে কুরআন শেখানো এবং দীর্ঘ জীবনের নানা স্মৃতি রেখে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
0 Response to "১২৩ বছরের জীবনের অবসান! চশমা ছাড়াই কুরআন পড়তেন আব্বাস প্রামাণিক, চলে গেলেন না ফেরার দেশে"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন