যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে তিন সপ্তাহে তিনগুণ কলেরা রোগী, জরুরি সহায়তা চায় ডব্লিউএইচও
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে কলেরার সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে দেশটিতে এক সপ্তাহে শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজন কলেরা রোগীর সংখ্যা তিনগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, চলমান সংঘাত, মানুষের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, নিরাপদ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে সংক্রামক রোগটির বিস্তারের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এতে যুদ্ধাহত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যস্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ডব্লিউএইচওর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে ইয়েমেনে সন্দেহভাজন কলেরা রোগীর সংখ্যা ছিল ২১৭। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪৭-এ। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের এ পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮ হাজার ৩৪ জন সন্দেহভাজন কলেরা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ সময় রোগটিতে ২৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ মৃত্যু ঘটেছে সর্বশেষ চার সপ্তাহে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতিতে কলেরার পাশাপাশি হামসহ অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের বসবাস, বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশেষ করে সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলো নিরাপদ পানি, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অঞ্চলটিতে ডব্লিউএইচওর জরুরি বিষয়ক পরিচালক অ্যানেট হেইঞ্জেলম্যান বলেন, সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো এমন সব রোগের মুখোমুখি হচ্ছে, যেগুলোর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্ভব। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং নিরাপদ পানি, টিকাদান ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা না হলে কলেরার প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে আগে থেকেই সংকটের মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বাড়বে।
ইয়েমেনে চলমান সংঘাত দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল করে রেখেছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সমর্থনপুষ্ট সরকারের মধ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রবণতা সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সহিংসতা বৃদ্ধির পর ইয়েমেনে ২ লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের অনেকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন, যেখানে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন। এসব পরিস্থিতিতে কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন এমনিতেই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে; নতুন করে রোগের বিস্তার সেই সংকটকে আরও গভীর করছে।
ডব্লিউএইচওর মতে, কলেরার বাড়তি চাপ এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে সংঘর্ষে আহত বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সীমিত জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে একদিকে যুদ্ধাহতদের সেবা, অন্যদিকে সংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ—দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কলেরা মূলত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। ভিব্রিও কলেরি নামের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হতে পারে। দ্রুত শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ায় গুরুতর পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে দ্রুত ও পর্যাপ্ত ওরস্যালাইন বা উপযুক্ত তরল দেওয়া এবং গুরুতর রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টিকাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ইয়েমেনে ৯০ দিনের জরুরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের ৩ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংস্থাটি পেয়েছে মাত্র ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় প্রাপ্ত সহায়তার পরিমাণ অনেক কম। এই অর্থ দিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, দ্রুত সাড়া দেওয়ার দল মোতায়েন, কলেরা চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ইয়েমেনে কলেরা মোকাবিলায় এখন দ্রুত অর্থায়ন ও সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগ জরুরি। নিরাপদ পানি সরবরাহ, রোগ শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মধ্যে রোগটির বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
0 Response to "যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে তিন সপ্তাহে তিনগুণ কলেরা রোগী, জরুরি সহায়তা চায় ডব্লিউএইচও"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন