ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে সরকার’, বিএনপিকে কড়া সমালোচনা হাসনাত আবদুল্লাহর

ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে সরকার’, বিএনপিকে কড়া সমালোচনা হাসনাত আবদুল্লাহর


 বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, সরকারকে এমন একটি ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যার ইঞ্জিন ও চাকা নেই। তাঁর ভাষ্য, চালক যত দক্ষই হোন না কেন, গাড়ির মৌলিক কাঠামো ঠিক না থাকলে সেটিকে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এনসিপির জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণবিষয়ক কমিটি ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে। সেখানে তিনি রাষ্ট্র সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে এবং নাগরিকেরা ন্যায়সংগতভাবে সমান আচরণ পাবেন। কিন্তু তাঁর মতে, বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর পরিবর্তনের বদলে বিভিন্ন ব্যক্তির পদ ও অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী, আবার কেউ প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন; অথচ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাঠামোগত ত্রুটি দূর না করে শুধু চালকের আসনে পরিবর্তন আনলে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ

বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ থাকলেও দলের ভেতরে এমন একটি অংশ রয়েছে, যাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার বিএনপির পুরোনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে ৫ আগস্টের পর দলটিতে যুক্ত হওয়া নতুন অংশের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এখন দলের ভেতরে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বিপরীতে, নতুন করে যুক্ত হওয়া একটি অংশ ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বক্তব্যে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেননি তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ নেই।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই অনেক মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে কিছু ক্ষেত্রে এসব মামলা অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এনসিপির এই নেতা বলেন, থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কতটির অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত তদন্ত শেষ করা এবং যথাযথ অভিযোগপত্র দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা থাকলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তবে মামলা-সংক্রান্ত তাঁর অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা বা সরকারের বক্তব্য প্রদত্ত তথ্যে পাওয়া যায়নি।

অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সমালোচনা

সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও সমালোচনা করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার কথা বললেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তা অর্জন কঠিন হতে পারে। এ সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে আসার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে আইএমএফের পূর্বাভাস হিসেবে উল্লেখ করা এই সংখ্যার নির্দিষ্ট প্রতিবেদন, প্রকাশের তারিখ ও প্রযোজ্য অর্থবছর সম্পর্কে বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে প্রবৃদ্ধির এই হিসাবের প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। হাসনাতের মূল বক্তব্য ছিল, সরকারের ঘোষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান থাকলে তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত।

কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের তুলনায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বেশি পাচ্ছেন। সারসহ বিভিন্ন পণ্যের ডিলারশিপ বণ্টন এবং সরকারি ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে নির্দিষ্ট চুক্তি, প্রতিষ্ঠান বা নথির তথ্য বক্তব্যে তুলে ধরা হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘিরে অভিযোগ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সম্পদ বৃদ্ধি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এসব বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও তা প্রমাণিত হওয়ার মতো কোনো নথি বা বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা অভিযোগের জবাবও প্রদত্ত তথ্যে নেই। ফলে বিষয়গুলোকে হাসনাত আবদুল্লাহর উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

আওয়ামী লীগের দলীয় বিচার ও জবাবদিহির দাবি

আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিচার নয়, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে অতীতের অপরাধের দায় স্বীকার করেনি। অপরাধ স্বীকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের আলোচনা কীভাবে সামনে আসে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ টেনে এনসিপির এই নেতা বলেন, দেশটির বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ন্যাশনাল পার্টির রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি দেখা যেতে পারে। তাঁর দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করা, আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করা এবং পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলকে দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনার প্রশ্নে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে দলীয় দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির দাবি তুললেও এ বিষয়ে বিস্তারিত আইনি কাঠামো ব্যাখ্যা করেননি।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বার্তা

বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশেও বক্তব্য দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়া সত্ত্বেও অনেক নেতাকর্মী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত রয়েছেন। অন্যদিকে, দলের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বিএনপির মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের জন্য কাজ করা এবং দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করাই তাঁদের দায়িত্ব। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারের নীতি, বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এসব বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রমাণ সামনে এলে বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

0 Response to "ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে সরকার’, বিএনপিকে কড়া সমালোচনা হাসনাত আবদুল্লাহর"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন