রমনা কালী মন্দিরে স্বর্ণ চুরি, সিসিটিভির সূত্র ধরে গ্রেপ্তার দম্পতি—তদন্তে উঠে এলো আরও দুই মন্দিরের ঘটনা
রাজধানীর রমনা কালী মন্দিরে বিগ্রহের মুখ থেকে স্বর্ণ চুরির ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে এই দম্পতির বিরুদ্ধে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মোট তিনটি মন্দিরে স্বর্ণ চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। চুরির স্বর্ণ কেনার অভিযোগে দক্ষিণখানের একটি জুয়েলারি দোকানের মালিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আরও কোনো ঘটনায় তারা জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন। গ্রেপ্তার দুজন হলেন লিপি কর্মকার (২৯) ও অর্ণব রায় দীপ্ত (৩০)। পুলিশ জানায়, উত্তরখানের দোবাদিয়া এলাকা থেকে গত রোববার সকালে তাদের আটক করা হয়। পরে শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলায় তাদের আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তারা ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর দিনের কোনো এক সময় রমনা কালী মন্দিরের বিগ্রহের মুখ থেকে প্রায় ছয় আনা ওজনের স্বর্ণ চুরি হয়। চুরি যাওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ছিল ৮০ হাজার টাকা। বিষয়টি জানার পর মন্দিরের পুরোহিত সুজিত চক্রবর্তী শাহবাগ থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে মন্দিরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। পরে ভিডিও বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। একপর্যায়ে উত্তরখানের দোবাদিয়া এলাকা থেকে ওই দম্পতিকে আটক করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার দক্ষিণখান এলাকার ‘সাদিয়া জুয়েলার্স’ নামের একটি দোকানে অভিযান চালানো হয়। চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে দোকানটির মালিক মুহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তার কাছ থেকে দুই আনা এক রতি চার পয়েন্ট ওজনের স্বর্ণের পাত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রমনা কালী মন্দির থেকে স্বর্ণ চুরির দিনই লিপি কর্মকার ওই দোকানে গিয়ে স্বর্ণ বিক্রি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে স্বর্ণ চুরির একটি ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় রমনা থানায় মামলা হয়েছিল। তদন্তে এই দম্পতির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। এ ছাড়া গত ১১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকার লোকনাথ মন্দির থেকে বিগ্রহের গলার স্বর্ণের চেইন চুরি করে পালানোর সময় তারা মন্দিরের পুরোহিতের হাতে ধরা পড়েছিলেন বলেও জানানো হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, দেওভোগের ঘটনায় তাদের হাতেনাতে ধরা হলেও পরে মন্দির কমিটির সদস্যরা তাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই ঘটনার বিস্তারিত ও সংশ্লিষ্ট সব তথ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তিনটি ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য কোনো মন্দিরে চুরির ঘটনায় তারা জড়িত কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা হবে।
সামনে দুর্গাপূজা থাকায় মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বলেন, মন্দিরে চুরির ঘটনা সংবেদনশীল হওয়ায় পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছে। তিনি জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পূজাকে কেন্দ্র করে কোথাও সহিংসতা বা বড় ধরনের সমস্যা দেখা যায়নি। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
এ ঘটনায় চুরি, চোরাই স্বর্ণ কেনাবেচা এবং সম্ভাব্য অন্য সহযোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
0 Response to "রমনা কালী মন্দিরে স্বর্ণ চুরি, সিসিটিভির সূত্র ধরে গ্রেপ্তার দম্পতি—তদন্তে উঠে এলো আরও দুই মন্দিরের ঘটনা"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন