রাজবাড়ীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে কমেছে জাল জব্দ ও জেলের কারাদণ্ড
রাজবাড়ীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে গত বছরের তুলনায় এ বছর অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ এবং কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে ২২ দিনের অভিযানে ৩০ লাখ ১৫ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হলেও ২০২৬ সালে জব্দ হয়েছে ১৬ লাখ ৫৫ হাজার মিটার। একই সময়ে গত বছর ১৭১ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা ৪৬।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ৯৭টি অভিযান ও ১৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক।
অভিযানে জব্দ ১৬ লাখ ৫৫ হাজার মিটার জাল
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের অভিযানে অবৈধভাবে মাছ ধরার অপরাধে ৭৮টি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৬ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪৬ জনকে। অভিযানে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
এ সময় ২৭৮ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা মাছ বিভিন্ন এতিমখানা ও দুস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। জব্দ করা মালামাল নিলামে বিক্রি করে আয় হয়েছে ১ লাখ ১০০ টাকা বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য অধিদপ্তর।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই মেয়াদের অভিযানে ১৭২টি অভিযান ও ৫৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছিল। সে সময় ইলিশ ধরার অপরাধে ১৭১ জন জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২২ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করেছিল নৌপুলিশ।
গত বছর অভিযানে ৩০ লাখ ১৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। জব্দ করা এসব জালের আনুমানিক মূল্য ছিল ৫ কোটি ৮৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১ হাজার ১১৮ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করে এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছিল। আটক নৌকা নিলামে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় ৯৭ হাজার টাকা। সে বছর জেলেদের কাছ থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছিল।
অভিযান কম হওয়া নিয়ে উদ্বেগ, কর্মকর্তার ব্যাখ্যা
দুই বছরের তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে অবৈধ জাল জব্দের পরিমাণ কমেছে ১৩ লাখ ৬০ হাজার মিটার। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জেলের সংখ্যা কমেছে ১২৫ জন। একই সঙ্গে অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সংখ্যাও কমেছে।
এদিকে, রাজবাড়ীর কয়েকজন সচেতন নাগরিকের অভিযোগ, চলতি বছর মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান তুলনামূলক ঢিলেঢালাভাবে পরিচালিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদীর পাড়ে অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ বিক্রি করা হয়েছে। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ সংরক্ষণের স্বার্থে নদীতে অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি নদীর পাড়ে মাছ বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তাঁরা।
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক অভিযানের কার্যক্রম কম হওয়ার পেছনে নদীর পরিস্থিতি ও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযানের প্রথম সপ্তাহে নদীতে স্রোত থাকায় জেলেরা তেমনভাবে নদীতে নামেননি। ফলে ওই সময়ে জাল জব্দ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সংখ্যা কম ছিল।
তিনি আরও জানান, অভিযানের মাঝামাঝি সময়ে জেলেদের তৎপরতা বাড়লে অভিযান পরিচালনা করে জাল জব্দ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর মধ্য দিয়েই মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
গত দুই বছরের পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য রাজবাড়ীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে জাল জব্দ বা কারাদণ্ডের সংখ্যা কমে যাওয়াই এককভাবে ইলিশ সংরক্ষণে অভিযানের কার্যকারিতা কমেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযানের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা মানার হার, নদীতে মাছ ধরার প্রবণতা এবং বাজারে অবৈধ ইলিশ বিক্রি বন্ধের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন
0 Response to "রাজবাড়ীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে কমেছে জাল জব্দ ও জেলের কারাদণ্ড"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন