আলুর দরপতনে বীজেও ধস, রংপুরে লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশও বিক্রি হয়নি

আলুর দরপতনে বীজেও ধস, রংপুরে লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশও বিক্রি হয়নি

 

টানা দুই মৌসুমে আলুর দরপতনের প্রভাব এবার পড়েছে বীজ আলুর বাজারেও। লোকসানের আশঙ্কায় রংপুর অঞ্চলে সরকারি বীজ আলু সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ডিলাররা। ফলে বিক্রির মৌসুম শুরু হলেও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ আলু বিক্রি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় সংস্থাটির অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ৮১৩ জন। চলতি মৌসুমে এসব জেলায় ৪ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর বিক্রি শুরু হওয়ার পর ৫ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ৭৪ জন ডিলার ৩৬৬ মেট্রিক টন বীজ সংগ্রহ করেছেন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশেরও কম বিক্রি হয়েছে।

জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বীজ আলু বিক্রি হয়েছে রংপুরে, ২২৬ মেট্রিক টন। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া লালমনিরহাটে ৪৫, গাইবান্ধায় ৪০ এবং নীলফামারীতে ৩৮ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রি হয়েছে।

ডিলারদের আগ্রহ বাড়াতে প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে বিএডিসি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা সরাসরি ও ফোনে যোগাযোগ করেও ডিলারদের বীজ সংগ্রহে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন। তবে কৃষকের চাহিদা কম থাকায় তেমন সাড়া মিলছে না।

রংপুর অঞ্চলের ১২টি হিমাগার থেকে ডিলারদের কাছে বীজ আলু সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে প্রথম গ্রেডের বীজ আলুর কেজি ২৭ টাকা। অথচ হিমাগারে সংরক্ষিত খাবার আলুর দাম নেমে এসেছে কেজিপ্রতি প্রায় ১২ টাকায়। ফলে খাবার আলু ও বীজ আলুর দামের বড় ব্যবধান ডিলারদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা বাজারের ডিলার মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, গত বছর পাঁচ টন বীজ আলু সংগ্রহ করে লোকসানে পড়েছিলেন তিনি। এবারও একই পরিমাণ বীজ সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও লাভের সম্ভাবনা দেখছেন না। তাঁর ভাষ্য, লাইসেন্স ধরে রাখার প্রয়োজনেই বীজ তুলতে হচ্ছে। কৃষকের চাহিদা না থাকলে বীজ কিনে পুঁজি আটকে রাখার কোনো অর্থ হয় না।

বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বলেন, ডিলাররা সাধারণত কৃষকের আগাম চাহিদা ও বুকিং অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ করেন। কিন্তু টানা দুই বছর লোকসানের কারণে কৃষকেরা এবার আলু চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়েছে বীজ আলুর বিক্রিতেও।

কৃষক ও ডিলারদের অভিযোগ, প্রতি বছর আলুর উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। দেশে মোট চাহিদা কত, কত পরিমাণ আলু উৎপাদন করা প্রয়োজন, হিমাগারের সংরক্ষণক্ষমতা কত এবং উদ্বৃত্ত আলু কীভাবে বাজারজাত করা হবে—এসব বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা না থাকায় অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় দাম পড়ে যায়।

কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, গত মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন মৌসুমের বীজ বাজারে এসেছে। খাবার আলুর দাম যেখানে কেজিপ্রতি প্রায় ১২ টাকা, সেখানে সরকারি বীজ আলুর দাম ২৭ টাকা হওয়ায় কৃষক ও ডিলার উভয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, কৃষক, ডিলার ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি, সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এসব উদ্যোগ না নিলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকদের লোকসানের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।

0 Response to "আলুর দরপতনে বীজেও ধস, রংপুরে লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশও বিক্রি হয়নি"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন