নেত্রকোণার হাওরে দেশি মাছের সংকট

নেত্রকোণার হাওরে দেশি মাছের সংকট

 

একসময় দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে এখন মাছের সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নদী-নালা, বিল ও হাওরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না অনেক জেলে। মাছের অভাবে আয় কমে যাওয়া, নৌকা চালানো ও জাল মেরামতের খরচ না ওঠা এবং ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের। দীর্ঘদিনের পারিবারিক পেশা ধরে রাখতে না পেরে কেউ কেউ জীবিকার বিকল্প পথও খুঁজছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মৎস্যসম্পদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হাওরের জলজ প্রতিবেশ ও দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। গবেষণা সংস্থা বারসিকের সাম্প্রতিক তথ্যেও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে দেশীয় স্বাদুপানির মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় দশক আগে এ অঞ্চলে অন্তত ১১৫ প্রজাতির দেশীয় মাছের বিচরণ ছিল। বর্তমানে মাছের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং ২৯টি প্রজাতি এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬১ প্রজাতির মাছের দেখা মেলে। এর মধ্যে ৪৩টি প্রজাতি বিপন্ন, ১১টি চরম বিপন্ন এবং আরও ১২টি প্রজাতি তীব্র সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রজাতির সংখ্যা ও ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাসে ব্যবহৃত গবেষণার মূল প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন। এসব পরিসংখ্যান হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

নেত্রকোণার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ী ও কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলে মাছের সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলেদের দৈনন্দিন জীবনে। মদন উপজেলার প্রবীণ জেলে ওয়াহাব মিয়া (৭০) প্রায় ছয় দশক ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্ষায় হাওরে মাছ ধরা আর শুকনো মৌসুমে কৃষিশ্রমিক হিসেবে ধান কাটাই ছিল তাঁর আয়ের প্রধান ভরসা। কিন্তু বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে হাওরে মাছের এমন সংকট আগে দেখেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। চার সদস্যের পরিবারের খরচ জোগাতে এখন তাঁকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

ওয়াহাব মিয়ার মতো অন্য জেলেরাও বলছেন, মাছ পাওয়া না গেলেও প্রতিদিন নৌকা চালানো, জ্বালানি তেল কেনা ও জাল মেরামতের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। সারাদিন হাওরে ঘুরেও পর্যাপ্ত মাছ না পেলে সেই খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে যাচ্ছে, অনেককে ঋণও করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মাছ ধরার পেশা ছেড়ে দিনমজুরি কিংবা কৃষিশ্রমিকের কাজ বেছে নিচ্ছেন।

মাছের সংকটের প্রভাব শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হাওর থেকে দেশীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বাজারে দেশীয় মাছের ঘাটতি পূরণে ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক খামারে উৎপাদিত মাছের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে মাছ ধরা থেকে শুরু করে পরিবহন, পাইকারি বিক্রি ও খুচরা বিপণনের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষের জীবিকাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নির্বিচারে মাছ আহরণ, প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা ধরা এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এ সংকটের অন্যতম কারণ। ‘চায়না দুয়ারী’ ও মিহি ফাঁসের জালের মাধ্যমে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ, রেণু ও পোনা ধরা পড়ছে। এতে মাছের বংশবিস্তারের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া কোথাও কোথাও বিষাক্ত রাসায়নিক, গ্যাস ট্যাবলেট ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে জলাশয়ে মিশে জলজ প্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমানের মতে, প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে বর্তমানে টিকে থাকা দেশীয় মাছের প্রজাতিগুলোও আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর মতে, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ নিশ্চিত করতে জলাশয় সংরক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নেত্রকোণা জেলায় একসময় ১৩৫টি হাওর, ৮২৪টি বিল, ১১৫টি নদী ও ৪৩৯টি প্রাকৃতিক খাল ছিল বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পলি জমে জলাশয় ভরাট হওয়া, অবৈধ দখল এবং জলাভূমির আয়তন সংকুচিত হওয়ার কারণে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাশয়ের গভীরতা, পানিপ্রবাহ ও প্রজননক্ষেত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে মাছের বংশবিস্তারের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ জানিয়েছেন, দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী সংরক্ষণে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, মদন ও খালিয়াজুড়ী উপজেলায় বর্তমানে কোনো সরকারি মাছের অভয়াশ্রম নেই। নতুন অভয়াশ্রম স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব ও আবেদন পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত জালের ব্যবহার বন্ধ, মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং আইন প্রয়োগ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

নেত্রকোণার হাওরে দেশীয় মাছের সংকট এখন পরিবেশগত উদ্বেগের পাশাপাশি জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, ক্ষতিকর জাল ও পদ্ধতি বন্ধ, জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলোর পেশা টিকিয়ে রাখতেও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ

0 Response to "নেত্রকোণার হাওরে দেশি মাছের সংকট"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন