২০২৭ সালের পাঠ্যবই নিয়ে উদ্বেগ, ছাপায় ধীরগতি ও ছবি বিতর্ক

২০২৭ সালের পাঠ্যবই নিয়ে উদ্বেগ, ছাপায় ধীরগতি ও ছবি বিতর্ক


 নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে বইয়ের ছবি নিয়ে বিতর্ক ও সংশোধনের দাবি, অন্যদিকে মুদ্রণকাজের ধীরগতি, নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ এবং দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে জানুয়ারির শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের মাত্র ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ পিছিয়ে রয়েছে। একই সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার এবং প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের কয়েকটি বইয়ে নৌকার ছবি থাকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

বই ছাপার অগ্রগতি: মাধ্যমিকে পিডিআই ২৮ শতাংশ

এনসিটিবির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি বই পিডিআই সম্পন্ন হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে, যা মোট বইয়ের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৬টি বইয়ের মধ্যে ৬ কোটি ২৮ লাখ ২ হাজার ৮টি ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৩৬০টি বই, যা মোটের ৭১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ১২১টি ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে। পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৩টি বইয়ের, যা মোট বইয়ের ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

অন্যদিকে, মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বইয়ের মধ্যে ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৫টি ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে। পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৫ কোটি ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৫২টি বইয়ের, যা মোট বইয়ের ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার দায়িত্ব পাওয়া ১১০টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠান এখনো যথাযথভাবে কাজ শুরু করেনি। কিছু প্রতিষ্ঠানের কোনো বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়নি বলেও জানা গেছে। তবে পিডিআইয়ের সংখ্যা ও প্রকৃত পরিদর্শন নিয়ে মুদ্রণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কিছু প্রেসের যোগসাজশে পিডিআইয়ের সংখ্যা বেশি দেখানো হতে পারে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

এ ছাড়া নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টার অভিযোগে প্রায় ১০ লাখ ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে এবং প্রাথমিক স্তরের ৩ হাজার ৩৩৪টি বই বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দাঁড়িপাল্লার পর নৌকার ছবি নিয়েও বিতর্ক

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ের ছবি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘নলেজ পিরামিড’ বা জ্ঞানের পিরামিডে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসার পর। আপত্তির মুখে ওই পৃষ্ঠার সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মোট ৩৮ লাখ কপির মধ্যে ২০ লাখ বিদ্যালয় পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি ১৮ লাখ কপি ছাপার কাজ চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিতর্কিত ছবি থাকা পৃষ্ঠা সংশোধনের জন্য সরবরাহ করা বই ফিরিয়ে এনে সংশোধিত পৃষ্ঠা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান মুদ্রণকাজেও প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

এনসিটিবির সদস্য এ কে এম শওকত আলী খান জানিয়েছেন, জ্ঞানের পিরামিডে উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা—এই চারটি স্তরের নাম থাকবে, তবে কোনো আইকন রাখা হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিষয়টি আরও পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহার নিয়েও আপত্তি উঠেছে। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট ৮২টি নৌকার ছবি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বইয়ে ৩৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩টি এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি ছবি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ছবিগুলো এবার নতুন করে যুক্ত করা হয়নি; ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বইয়েও একই ধরনের ছবি ছিল। বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এসব ছবি ব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তবে ছবি নিয়ে আপত্তি এবং সেগুলো সংশোধন বা বাতিলের দাবি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট বইটি পর্যালোচনা করে বিস্তারিত জানাতে পারবেন। ফলে নৌকার ছবি নিয়ে আপত্তির বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে সংশ্লিষ্ট বই, ছবি ব্যবহারের প্রেক্ষাপট এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ, পুনঃদরপত্রে সাশ্রয়

পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু দরপত্রে প্রাক্কলিত দরসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস করে একক দরদাতার মাধ্যমে কাজ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফল ও প্রামাণ্য নথি গুরুত্বপূর্ণ।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, একক দরদাতা অংশ নেওয়া, কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা এবং বিকল্প দরদাতা না পাওয়ার কারণে ৩৪টি লটে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব লটে ইবতেদায়ি, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পুনঃদরপত্রের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৪টি লটে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত দর ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। অন্যদিকে, সুপারিশপ্রাপ্ত মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর দর ছিল ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৬ টাকা। ফলে এসব লটে প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দরপত্রের নথি অনুযায়ী, ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একজন করে দরদাতা অংশ নিয়েছিলেন। বাকি দরপত্রগুলোর কয়েকটিতে দুজন এবং অন্য দুটিতে তিনজন করে দরদাতা প্রস্তাব জমা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দরপত্রে অনিয়ম ও তথ্য ফাঁসের অভিযোগে কয়েকজন মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মালিকের নামও এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকদের কেউ কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং মুদ্রণকাজে সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে তদন্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল খান বই ছাপার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও তদারকি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, পিডিআই সম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা এবং মাঠপর্যায়ে পাঠানো বইয়ের সংখ্যার মধ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা যাচাই করা উচিত।

অন্যদিকে, এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, বইয়ে পাওয়া ভুলত্রুটি সংশোধন করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে মানসম্পন্ন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে বোর্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার অগ্রগতি, ছবির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক এবং দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ—তিনটি বিষয়ই এখন আলোচনায় রয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে বইয়ের মান নিশ্চিত করা, অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং সময়মতো সব শিক্ষার্থীর হাতে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া এনসিটিবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

0 Response to "২০২৭ সালের পাঠ্যবই নিয়ে উদ্বেগ, ছাপায় ধীরগতি ও ছবি বিতর্ক"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন