মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে, কিন্তু অর্থনীতির আকারে পিছিয়ে বাংলাদেশ
একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বলা হয়। এই মোট উৎপাদনকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি। এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনের গড় চিত্র তুলে ধরে, তবে একজন নাগরিকের প্রকৃত আয় বা জীবনযাত্রার মান সরাসরি নির্ধারণ করে না।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়।
মাথাপিছু জিডিপির হিসাব একটি দেশের মোট উৎপাদন ও জনসংখ্যার অনুপাতের ওপর নির্ভর করে। তাই জনসংখ্যার আকার, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর পার্থক্যের কারণে মোট অর্থনীতি ছোট হলেও কোনো দেশ নির্দিষ্ট সময়ে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকতে পারে।
ক্রয়ক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে ভারত
মাথাপিছু জিডিপির পূর্বাভাসে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) অনুযায়ী ভারত এগিয়ে রয়েছে। পিপিপি হিসাব করতে দুই দেশের স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দামের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপি হিসাবে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ ডলারে মাথাপিছু জিডিপি বেশি হলেও স্থানীয় বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি হবে, এমন নয়।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে তা হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বেশি হলে সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপও বেশি থাকে, যা পরিবারের ব্যয় সামলানো কঠিন করে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও ভারত এগিয়ে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এ ছাড়া আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলার এবং ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলার হতে পারে। ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার। এসব পরিসংখ্যান পূর্বাভাস, চূড়ান্ত ফল নয়; বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এগুলো পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই শিল্প রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণে অবদান রেখেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে উদ্ধৃত অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প, কৃষি এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার দেশটির অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে সমর্থন জোগায়। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধরন ও প্রধান চালিকাশক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
জ্বালানি ব্যয় ও রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দাম এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবহন ব্যয় আরও চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আসে বলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিলে এ খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। তবে প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য মূল্যায়নে মোট উৎপাদন, কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয়, মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও বিবেচনায় নিতে হবে। পূর্বাভাস বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
0 Response to "মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন