মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের অর্থের উৎস নিয়ে উদ্বেগ, চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু খাতে
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফুটপাতের দোকান, পরিবহন, গ্যারেজ, নার্সারি এবং বিভিন্ন ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অপরাধের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
কালবেলার সরেজমিন অনুসন্ধান অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন নামে পরিচিত কয়েকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দোকান নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায়, ছিনতাই ও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফুটপাত ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মোহাম্মদপুরের বসিলা সড়কে ফুটপাতের দোকান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর ময়ূর ভিলার সামনে দুই ব্যক্তির ওপর গুলি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ফুটপাতের দোকানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র রয়েছে। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় ফরহাদ নামে এক ব্যক্তি নিহত হন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বসিলা সড়কের ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দোকানের অবস্থান ও সারি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হারে টাকা নেওয়া হয় বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।
এ ছাড়া বেড়িবাঁধ সড়কের বিভিন্ন নার্সারি, রিকশার গ্যারেজ ও অটোস্ট্যান্ডকে ঘিরেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তবে অভিযোগগুলোর প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মাদক কারবার ও পরিবহন খাতেও অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের কয়েকটি এলাকায় মাদক বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রগুলো আদাবর, শেখেরটেক, তুরাগ হাউজিং ও নবোদয় হাউজিংসহ কয়েকটি এলাকার নাম উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া গণপরিবহনের বাস ও লেগুনার বিভিন্ন স্ট্যান্ড এবং রুটকে ঘিরেও চাঁদাবাজির অভিযোগ জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাতের পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ এবং বাসাবাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পায় বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন।
কিছু অভিযোগে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের নামও এসেছে। তবে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া বিবেচনা করা জরুরি। প্রতিবেদনে কয়েকজন ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যও বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধ দমনে পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধের তাগিদ
মোহাম্মদপুর ও আদাবরে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান কালবেলাকে জানান, বসিলা সড়কে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর ওই এলাকায় দোকান বসানো বন্ধ রাখতে এবং সড়ক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে সড়কের কিছু অংশে দোকান দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগের মতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অপরাধীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার প্রবণতা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধে মদদদাতাদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির কিশোর গ্যাং, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও তিনি বক্তব্য দেন।
মোহাম্মদপুর ও আদাবরের এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ করা স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব
0 Response to "মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের অর্থের উৎস নিয়ে উদ্বেগ, চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু খাতে"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন