ইশরাকের পদত্যাগ মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ-ডিএনসির ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ইশরাকের পদত্যাগ মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ-ডিএনসির ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

 

মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনার দুই দিন পর সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যের পর রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ডিএনসি।

তবে একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে অংশ নেওয়া যথাযথ হয়নি বলে মত দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদেরও আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাকের বক্তব্য

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি থানা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার অনুরোধ করেও মাদক সমস্যার কার্যকর সমাধান পাননি। থানা ও পুলিশ প্রশাসনের বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের যানবাহন ধ্বংস, জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তাঁর দাবি, ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যেতে পুলিশ অনীহা দেখাত। ওই এলাকায় আগে ছাদ থেকে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে এবং পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সংস্থার কাছে বারবার যাওয়ার পরও সমাধান না পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের চাপের মুখে তিনি পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেন। অভিযানের তথ্য আগে থেকে জানালে তা ফাঁস হয়ে অপরাধীরা পালিয়ে যেতে পারে—এ আশঙ্কায় তিনি সংশ্লিষ্টদের শেষ মুহূর্তে জানাতেন বলেও দাবি করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র ও প্রভাবশালী শক্তির সহায়তায় দেশে মাদক প্রবেশ করছে। সীমান্তে তারকাঁটার ওপর দিয়ে ড্রোনের সাহায্যে মাদক ফেলার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, গেন্ডারিয়ার রেললাইনসংলগ্ন ঘুণ্টিঘর এলাকা মাদক বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়ছিল। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।

অস্ত্র হাতে অভিযানে যাওয়ার সমালোচনা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে অংশ নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশ দায়িত্ব পালন না করলে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো কিংবা ডিএনসিকে তলব করার সুযোগ ছিল বলে তিনি মত দেন।

তাঁর মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনের শাসন ও সুশাসনের পরিপন্থি। তবে ইশরাক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলেছেন, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, শুধু মাদক বহনকারী কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক প্রবেশের উৎস, সীমান্তপথ এবং এর পেছনে অর্থ বিনিয়োগকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব জড়িত থাকার অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদক একটি বড় সামাজিক সমস্যা, যার সঙ্গে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো আর্থসামাজিক কারণও যুক্ত। তাই নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি এসব কারণ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁর মতে, পুলিশের দায়িত্ব পুলিশকেই পালন করতে দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বা প্রশাসনিক কাজে কোনো ঘাটতি থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে যাওয়া ও পরে ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনাকে তিনি অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পদক্ষেপ দলীয় ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ডিএনসির বক্তব্য

ইশরাকের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সংস্থাটির সক্ষমতা সীমিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকা ডিএনসির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই; সেখানে অন্য সংস্থাও দায়িত্ব পালন করে। ডিএনসি মাদকের রুট শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করে বলে তিনি জানান। সীমান্ত দিয়ে নতুন পথে মাদক প্রবেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জানার কথা বলেন তিনি।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি।

0 Response to "ইশরাকের পদত্যাগ মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ-ডিএনসির ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন