শৈশবে টাকা চুরি করলে কীভাবে পরিশোধ করবেন? ইসলামে যা বলা হয়েছে
শৈশবে অনেকেই না বুঝে এমন কিছু কাজ করে ফেলেন, যা বড় হওয়ার পর অন্যায় বলে উপলব্ধি করেন। কখনো পরিবারের কারও পকেট থেকে অনুমতি ছাড়া টাকা নেওয়া, আবার কখনো অন্যের বাগান থেকে না বলে ফল পেড়ে খাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কাজের জন্য অনুশোচনা তৈরি হতে পারে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, অতীতের সেই ভুলের জন্য কীভাবে ক্ষমা পাওয়া সম্ভব এবং যার সম্পদ নেওয়া হয়েছিল, তাঁর অধিকার কীভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে?
এমনই একটি প্রশ্ন করেছেন এক ব্যক্তি। তিনি জানান, ১২-১৩ বছর বয়সের আগে পরিবারের একজন মুরুব্বির কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভোগেন। পরে সরাসরি ঘটনার কথা না জানিয়ে ওই ব্যক্তিকে বলেন, তিনি তাঁর কাছে কিছু টাকা পাওনা আছেন, তবে সঠিক পরিমাণ জানেন না। এরপর অনুমান করে কিছু টাকা পরিশোধ করেন। এখন তাঁর প্রশ্ন, এভাবে টাকা দেওয়ার পর তিনি পুরোপুরি দায়মুক্ত হয়েছেন কি না।
ইসলামী দৃষ্টিতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করার পাশাপাশি অন্যের সম্পদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দায়মুক্তির বিষয়টি নির্ভর করে কত টাকা নেওয়া হয়েছিল, কতটা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং বাকি কোনো পাওনা রয়েছে কি না—এসবের ওপর।
তওবা ও মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি
ইসলামে তওবার ক্ষেত্রে অনুতপ্ত হওয়া, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হলে, সম্ভব হলে সেই সম্পদ বা তার সমপরিমাণ অর্থ মালিককে ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২২)
প্রশ্নকারী যেহেতু নিজের ভুল উপলব্ধি করে টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে অনুমান করে দেওয়া অর্থ যদি নেওয়া টাকার সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অর্থের অধিকার আদায়ের দিক থেকে তাঁর দায় পূরণ হয়ে থাকতে পারে। আর যদি কম দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাকি অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
পরিমাণ নিশ্চিত না হলে করণীয়
শৈশবে ঠিক কত টাকা নেওয়া হয়েছিল, তা মনে না থাকলে যথাসম্ভব সতর্কতার সঙ্গে হিসাব করার চেষ্টা করা উচিত। নিজের স্মৃতি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ করে এমন অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত, যাতে পাওনাদারের অধিকার বাকি থাকার আশঙ্কা না থাকে।
সরাসরি ঘটনা জানাতে অস্বস্তি হলে উপহার বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য উপায়ে অর্থ পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু কিছু টাকা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত পাওনা পরিশোধ হয়েছে কি না, সেটিই মূল বিষয়। এখনো যদি প্রবলভাবে মনে হয় যে অর্থ কম দেওয়া হয়েছে, তাহলে অবশিষ্ট অংশও পরিশোধ করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী হাদিসে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর প্রাপ্তবয়স্কের মতো শরয়ি দায়িত্ব আরোপের ক্ষেত্রে পার্থক্যের কথা এসেছে। আবু দাউদে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, তিন শ্রেণির ব্যক্তির কাছ থেকে কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে—ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালেগ হওয়া পর্যন্ত এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৩৯৮)
তবে শরয়ি দায়বদ্ধতার বিষয়টি আর অন্যের সম্পদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এক নয়। তাই শৈশবে ঘটনাটি ঘটলেও কারও অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।
সবশেষে, প্রশ্নকারী আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন—এটি আশাব্যঞ্জক। এখন তাঁর করণীয় হলো, যথাসম্ভব সঠিক হিসাব করে পাওনা পুরোপুরি পরিশোধ করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে অন্যের সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। নির্দিষ্ট ঘটনার শরয়ি বিধান নিশ্চিত করতে বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
0 Response to "শৈশবে টাকা চুরি করলে কীভাবে পরিশোধ করবেন? ইসলামে যা বলা হয়েছে"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন