চামড়াশিল্পে নতুন গতি ফেরাতে চায় বিসিক
দেশের চামড়াশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে দেশের চামড়াশিল্পের অধঃপতন হয়েছে। এ খাতের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়েছে। এখন আর সময়ক্ষেপণ না করে চামড়াশিল্পকে আবারও এগিয়ে নিতে চায় বিসিক।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিসিক আয়োজিত জব অ্যান্ড ক্যারিয়ার ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান এবং দেশের শিল্প খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, দেশে শিল্পায়নের প্রসার ঘটানো এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে বিসিক। বর্তমানে সারা দেশে সংস্থাটির ৮৪টি শিল্পনগরী রয়েছে। এসব শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে গ্রাহকদের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তারা যাতে তাঁদের পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরতে পারেন এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পান, সে জন্য নিয়মিত মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। বেনজীর আহমেদ জানান, প্রতি মাসে মেলার আয়োজনের পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরে আরও বড় পরিসরে একটি মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে চায় বিসিক।
দেশের শিল্পায়নের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একসময় প্রধানত কৃষিনির্ভর ছিল। সে সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘরে ঘরে কুটিরশিল্প গড়ে উঠেছিল। ১৯৫৭ সালে ইপসিক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ শুরু হয়। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিকে রূপ নেয়। এরপর থেকে দেশের শিল্পায়নে সংস্থাটি ভূমিকা রেখে আসছে।
বর্তমান শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, একসময় দেশে তুলনামূলক কম শ্রমমূল্য ও গ্যাসের সহজলভ্যতা শিল্প উৎপাদনে সুবিধা দিত। কিন্তু এখন গ্যাসের সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত সুবিধার ওপর নির্ভর না করে দেশীয় কাঁচামাল কাজে লাগিয়ে পণ্য উৎপাদন এবং শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিসিকও দেশীয় কাঁচামালভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে।
শিল্পকারখানা স্থানান্তরের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, ঢাকার চামড়া, প্লাস্টিক ও মুদ্রণশিল্পের কারখানাগুলো বিসিকের শিল্প পার্কে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পিত শিল্প এলাকায় এসব কারখানা স্থানান্তর করা গেলে উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে চট্টগ্রাম নগরকে আরও বাসযোগ্য ও যানজটমুক্ত করতে শহরের বিভিন্ন কারখানা পরিকল্পিত শিল্পনগরে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরির উদ্যোগ
বিসিক আয়োজিত জব অ্যান্ড ক্যারিয়ার ফেয়ারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেনজীর আহমেদ বলেন, চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গ্রাহকদের সংযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতেও বিসিক কাজ করতে চায়।
মেলায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের স্টল স্থাপন করে। সেখানে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পান। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে কয়েকজন তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগপত্রও পেয়েছেন। এতে চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দেশে বেকারত্ব কমানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিসিকের এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের ঘোষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বিসিক কাজ করছে। তরুণদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরিতে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে বিসিককে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা, ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং অপরিকল্পিত গাড়ি পার্কিংয়ের মতো সমস্যা মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে আগ্রাবাদ এলাকায় ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের বড় অংশ হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সড়কের দুই পাশে গাড়ি রাখার কারণেও যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তাঁর মতে, যানজটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াতেও অসুবিধা হচ্ছে, যার প্রভাব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে পড়তে পারে। নগরকে আরও বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব করতে এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের তাগিদ
দি চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিসিকের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং চাকরি মেলায় চিটাগং চেম্বার যুক্ত থাকতে আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে বন্দরটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেকারত্ব বাড়তে থাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
বিসিকের পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বিসিক। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎমিলা ফরিদ বলেন, জব ফেয়ার শিক্ষা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরির সুযোগ করে দেয়।
লুৎমিলা ফরিদের মতে, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগদাতাদের চাহিদা এবং চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পান। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। মেলা থেকে পাওয়া মতামত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো গেলে পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি কমাতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বিসিক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক খালেদ মাহমুদ বলেন, উদ্যোক্তা তৈরি করা বিসিকের অন্যতম প্রধান কাজ। মেলায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখে তরুণরা চাকরির পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তুলতে উৎসাহিত হতে পারেন। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে অন্যদেরও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এস এম আলকাদেরী। আয়োজনে শিল্পায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণ এবং বেকারত্ব কমাতে বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সামগ্রিকভাবে, বিসিকের পরিকল্পনায় একদিকে চামড়াশিল্পসহ সম্ভাবনাময় শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা, অন্যদিকে দেশীয় কাঁচামালনির্ভর উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিকল্পনাগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ওপর।
0 Response to "চামড়াশিল্পে নতুন গতি ফেরাতে চায় বিসিক"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন