ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল-ইউনিভার্সিটির নতুন গন্তব্য ভারত

ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল-ইউনিভার্সিটির নতুন গন্তব্য ভারত


 যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্বখ্যাত বেশ কয়েকটি স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভারতে ক্যাম্পাস স্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা, উচ্চবিত্ত ও নতুন ধনী পরিবারের আগ্রহ এবং বড় শিক্ষাবাজারের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে ভারত এখন ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

একসময় চীন ছিল বিদেশে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে চীনের নীতিগত পরিবর্তন, শিক্ষাক্ষেত্রে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে, ভারতে এমন একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছে, যারা সন্তানদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত। ফলে দেশের বাইরে না গিয়েও ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ছে।

কেন ভারতের দিকে ঝুঁকছে ব্রিটিশ স্কুলগুলো?

ভারতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রযুক্তি, ব্যবসা ও শিল্প খাতে কর্মরত উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর একটি অংশ সন্তানদের বৈশ্বিক মানের শিক্ষা দিতে আগ্রহী। এই চাহিদাকে সামনে রেখে ব্রিটিশ স্কুলগুলো ভারতের বিভিন্ন শহরে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।

বেঙ্গালুরুতে কার্যক্রম পরিচালনা করা লন্ডনের হ্যারো স্কুলের প্রধান ক্যারোলিন প্যাসকো জানিয়েছেন, তাঁদের আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম অনেক পরিবারের কাছে বড় আকর্ষণ। অন্যদিকে, মোহালিতে ক্যাম্পাস স্থাপন করা বেডফোর্ড স্কুলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চীনে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বেসরকারি স্কুলের ওপর ভ্যাট বাড়ানোয় সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভারতে অবশ্য কয়েক দশক ধরেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘পাবলিক স্কুল’ পদ্ধতির আদলে পরিচালিত স্থানীয় বোর্ডিং স্কুল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গড়ে উঠেছে। তবে নতুন ধনী পরিবারের আগ্রহে এই বাজারের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

ভারতের যেসব শহরে ব্রিটিশ স্কুলের ক্যাম্পাস

ভারতের একাধিক শহরে যুক্তরাজ্যের পরিচিত স্কুলগুলো কার্যক্রম শুরু করেছে বা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

বেডফোর্ড স্কুল: পাঞ্জাবের মোহালিতে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

হ্যারো স্কুল: ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে ক্যাম্পাস চালু করে। ব্রিটিশ এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও রয়েছেন।

শ্রুসবারি স্কুল: মধ্য ভারতের ভোপালে ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে; ২০২৫ সালের আগস্টে সেখানে প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়েলিংটন কলেজ: পশ্চিম ভারতের পুনে শহরে কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে।

কুইন এলিজাবেথ স্কুল: গুরুগ্রামে শাখা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা বা উদ্যোগের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া আগামী কয়েক বছরে মিলফিল্ডসহ আরও কিছু ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের ভারতে ক্যাম্পাস খোলার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সময়সূচি ও বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক তথ্য থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

হ্যারো ও বেডফোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেমব্রিজ পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কেমব্রিজের আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের বহু স্কুলে অনুসৃত হওয়ায় এ ধরনের পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে বাড়তি সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস এবং সামগ্রিক বিকাশের বিষয়টিও অভিভাবকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মোহালিতে বেডফোর্ড স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন হরসিমরান সিং কোচার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পড়াশোনার পাশাপাশি চরিত্র গঠন ও আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। স্কুলটিতে ভিআইপি সংস্কৃতি না থাকার বিষয়টিও তাঁর কাছে ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে।

ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও বড় পরিকল্পনা

শুধু স্কুলশিক্ষা নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভারতের বাজার ধরতে আগ্রহী যুক্তরাজ্যের একাধিক শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশটিতে নিজস্ব ক্যাম্পাস বা শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে তারা ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে আন্তর্জাতিক ডিগ্রির সুযোগ পৌঁছে দিতে চায়।

এ উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন ভারতে ক্যাম্পাস চালু করেছে। ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুল বেঙ্গালুরুতে ক্যাম্পাস স্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক ও ইউনিভার্সিটি অব এবারডিন মুম্বাইয়ে ক্যাম্পাস স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ল্যাঙ্কাস্টার, ব্রিস্টল, কভেন্ট্রি এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের নামও এই সম্প্রসারণ উদ্যোগের তালিকায় রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণের পথ পুরোপুরি বাধাহীন নয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রাইভেট এডুকেশন পলিসি ফোরামের ২০২৫ সালের গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিয়মকানুনের পরিবর্তন, জাতীয় সরকারের তদারকি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের বাধার কারণে কিছু বিদেশি শিক্ষাবাজারে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে।

সব মিলিয়ে, ভারতের বড় শিক্ষাবাজার এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ব্রিটিশ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই সম্প্রসারণ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শিক্ষার মান বজায় রাখা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় চাহিদা পূরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়মকানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ওপর

0 Response to "ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল-ইউনিভার্সিটির নতুন গন্তব্য ভারত"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন