নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষা আর শেষ হলো না! সন্তানের খোঁজ না পেয়েই চলে গেলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান

নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষা আর শেষ হলো না! সন্তানের খোঁজ না পেয়েই চলে গেলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান


 ছোট ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। নিখোঁজ সন্তান নাবিল নাছির রহমান কুশলের সন্ধান চেয়েই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা নাসিমা খান। ছেলেকে খুঁজে পেতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছেন, গণমাধ্যমের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু সন্তানের কোনো খোঁজ পাওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের পরিচিত এই অভিনেত্রী।

রোববার, ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাসিমা খান। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন অভিনেত্রীর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নুরজাহান বেগম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

নাসিমা খানের ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল নিখোঁজ হন চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি। আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্ন বিলাশ এলাকা থেকে তিনি নিখোঁজ হন বলে জানা গেছে। এরপর থেকেই ছেলের সন্ধানে উদ্বিগ্ন ছিলেন অভিনেত্রী। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে তিনি সন্তানের সন্ধান পেতে সহযোগিতা চেয়েছিলেন।

ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে এক ভিডিওতে নাসিমা খান জানিয়েছিলেন, কুশল সাধারণত বাড়িতেই থাকতেন। বাইরে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও তাঁর কিছু বিধিনিষেধ ছিল। তবে ঘটনার দিন ছেলে বাইরে একটু ঘুরে আসতে চাইলে তাঁকে অনুমতি দিয়েছিলেন মা।

নাসিমার বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন কুশল তাঁকে বলেছিলেন, ঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে তাঁর ক্লান্ত লাগছে। তাই কিছুক্ষণ নিচে ঘুরে আসতে চান। এ সময় চা খাওয়ার জন্য মায়ের কাছে ৫০ টাকাও চেয়েছিলেন তিনি। ছেলের আবদারে সেই টাকা দিয়েছিলেন নাসিমা। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কুশল আর ফিরে আসেননি। ছেলের সেই সামান্য আবদার যে একসময় তাঁর জীবনের গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা তখন বুঝতে পারেননি অভিনেত্রী।

কুশল নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে পরিচিতজন ও আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজ নেন নাসিমা। কিন্তু কোথাও সন্তানের সন্ধান না পেয়ে পরে আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অভিনেত্রী জানিয়েছিলেন, ছেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নিজের দুটি মোবাইল ফোনই রেখে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো সুযোগও ছিল না।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন নাসিমা খান। ছেলেকে খুঁজে বের করার বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ ছিল, এ বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চেয়েও সন্তোষজনক উত্তর পাননি। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে থানা থেকে ফিরে আসেন তিনি।

ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে কুশল কোথায় আছেন, তিনি বেঁচে আছেন কি না—এমন নানা অনিশ্চয়তা তাঁকে তাড়া করত। একজন মা হিসেবে সন্তানের পরিণতি জানতে না পারার এই অপেক্ষা তাঁর জীবনের শেষ সময়কে আরও কঠিন করে তুলেছিল। তবে কুশলের নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ এবং তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

নাসিমা খানের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নুরজাহান বেগম জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন অভিনেত্রী। প্রায় সাত দিন আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নাসিমা খানের বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি দেশে ফিরলে অভিনেত্রীর দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাসিমা খান। ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরে ১৯৬১ সালে ‘যে নদী মরু পথে’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পরিচিতি পান। এরপর ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসিমা খান। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘যে নদী মরু পথে’ এবং ‘বেগানা’। সবশেষ ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছিল।

রুপালি পর্দায় দীর্ঘদিন দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন যে অভিনেত্রী, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁকে কাটাতে হয়েছে সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার বেদনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। ছোট ছেলের সন্ধান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ হলো তাঁর জীবনের পথচলা। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি প্রজন্মের স্মৃতিবিজড়িত অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

0 Response to "নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষা আর শেষ হলো না! সন্তানের খোঁজ না পেয়েই চলে গেলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন