যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: সরকারি দপ্তরের কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্রের একটি সেট, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, আটটি মোবাইল ফোন, নগদ টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
তিনি জানান, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময় থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। গোয়েন্দা অনুসন্ধান ও অভিযান চালিয়ে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর তৈরি এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। চক্রটির সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড চালাতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম এবং এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ ও কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল, মফিজুল ও সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্য এবং মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনা করে উত্তরখান ও মিরপুর-১০ এলাকা থেকে ইমদাদুল ও আসাদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৫ অক্টোবর সাভার থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার হন জাহাঙ্গীর।
সংস্থাটির দাবি, প্রাথমিক তদন্তে রুবেল ও মফিজুলের মাধ্যমে চক্রটির আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মফিজুল নিজেও চাকরিপ্রত্যাশী ছিলেন। এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, তিনি চক্রের একজনকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন। পরে বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মোবাইল ফোনের চ্যাট বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিতরণের সময় সম্পর্কেও তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পরে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে এসআরবি।
অভিযানে জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, প্রশ্নপত্রের এক সেট, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ১০টি সার্টিফিকেট, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংক চেক, বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র, আটটি মোবাইল ফোন এবং নগদ চার হাজার টাকা।
এসআরবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস, চক্রের অন্য সহযোগীদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
0 Response to "যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: সরকারি দপ্তরের কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন