গতকালও ছিল বেচাকেনার ধুম, রাতের আগুনে ধ্বংসস্তূপ মনসুর খান প্লাজা
এক দিন আগেও যেখানে ছিল ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা, দোকানিদের হাঁকডাক আর কর্মচারীদের কর্মচাঞ্চল্য, সেখানে এখন বিরাজ করছে পোড়া মালামালের গন্ধ, ধোঁয়া আর নিস্তব্ধতা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গেছে পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলিতে অবস্থিত মনসুর খান প্লাজার চিত্র। ভয়াবহ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির বিভিন্ন অংশ এখন ধ্বংসস্তূপের মতো দেখাচ্ছে। কোথাও পোড়া পণ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কোথাও অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে দোকান ও গুদামের ভেতর। ভবনের আশপাশে টানানো হয়েছে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা ফিতা। নিরাপত্তার কারণে সেখানে অবস্থান করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় সাড়ে ১২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন অংশ থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। আগুনের পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণের কাজ চলছিল।
সাড়ে ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আগুন
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সাততলা ভবনটির ষষ্ঠতলার একটি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করে।
ভবনের বিভিন্ন তলায় পণ্যভর্তি গুদাম থাকায় আগুন নেভানোর কাজ সহজ ছিল না। বিশেষ করে পাঁচ, ছয় ও সাততলায় বিভিন্ন ধরনের মালামাল মজুত ছিল। গুদামগুলোতে পণ্য স্তূপ করে রাখা থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া ও প্রচণ্ড তাপের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদেরও কাজ করতে বেগ পেতে হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর পর মঙ্গলবার ভোরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পুরোপুরি নির্বাপণ এক বিষয় নয়। সে কারণে ভবনের ভেতরে কোথাও আগুনের অবশিষ্ট তাপ বা ধোঁয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের কাজ চলতে থাকে।
নিরাপত্তার বেষ্টনী, বাইরে পুলিশের পাহারা
অগ্নিকাণ্ডের পর মনসুর খান প্লাজামুখী সড়কের দুই পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়। সেখানে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা ফিতা টানিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে। উৎসুক মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উদ্ধার ও পরবর্তী কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
ভবনটির ভেতরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। আগুনের তাপে ভবনের কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সরেজমিনে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এ কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কেট ও আশপাশের দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার কাজ শুরু করেন ডেসকোর কর্মীরা। আগুনের কারণে বিদ্যুৎব্যবস্থার কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা বিবেচনায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সকালে দোকানে এসে হতবাক মালিকরা
আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মালিকরা মার্কেটে আসতে শুরু করেন। তাঁদের অনেকের কাছে তখনো স্পষ্ট ছিল না, দোকানে থাকা কতটা মালামাল পুড়ে গেছে কিংবা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত। পোড়া পণ্য, এলোমেলো মালামাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত গুদাম দেখে অনেকেই উদ্বেগে পড়ে যান।
ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করাও সহজ হচ্ছে না। কারণ, গুদামে রাখা পণ্য, দোকানের মজুত এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। ভবনের ভেতরে নিরাপদে প্রবেশ ও পরিস্থিতি পরিদর্শনের সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা কঠিন।
অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কায় ভবনটির অন্য তলাগুলোতে থাকা কিছু দোকান থেকেও মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা যায় কর্মচারীদের। আগুনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও ভবনের অন্যান্য অংশে পণ্য রেখে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না তাঁরা। ফলে আগুনের পরদিনও মার্কেটজুড়ে চলছিল উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।
‘গতকালও বেচাকেনা ছিল, এখন সবকিছু ওলটপালট’
মার্কেটের এক দোকান কর্মচারী শাহ আলম বলেন, সেখানে তাঁর মালিকের একটি ব্যাগের দোকান রয়েছে। আগের দিনও দোকানে বেচাকেনা চলছিল। কিন্তু আগুনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
শাহ আলমের ভাষ্য, মঙ্গলবার সকালে ছয়তলায় উঠে চারপাশে পোড়া মালামাল পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি ব্যবসা এভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা কখনো ভাবেননি। তাঁর কথায়, গতকালও যেখানে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চলছিল, এখন সেখানে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।
শাহ আলমের বক্তব্যে অগ্নিকাণ্ডের পর ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের চিত্র ফুটে ওঠে। দোকান ও গুদামে থাকা পণ্যই অনেক ব্যবসায়ীর ব্যবসা পরিচালনার প্রধান অবলম্বন। সেসব পণ্য আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে ব্যবসা চালু করা, পুঁজি জোগাড় করা এবং আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
গুদামে বিপুল মালামাল থাকায় বেড়েছিল ঝুঁকি
জানা গেছে, মনসুর খান প্লাজার পাঁচ, ছয় ও সাততলায় বিভিন্ন পণ্যের গুদাম ছিল। এসব গুদামে বিপুল পরিমাণ মালামাল স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। ফলে ষষ্ঠতলার একটি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে ওঠে।
বড় মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবনে একাধিক তলায় গুদাম থাকলে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। গুদামে পণ্যের ধরন, মালামাল সাজিয়ে রাখার পদ্ধতি, চলাচলের পথ এবং আগুন নেভানোর সরঞ্জাম—সবকিছুই জরুরি পরিস্থিতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মনসুর খান প্লাজার অগ্নিকাণ্ডে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার নির্দিষ্ট কারণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরিদর্শনের ফল প্রয়োজন।
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তা
অগ্নিকাণ্ডে ঠিক কতটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত টাকার পণ্য পুড়েছে কিংবা ভবনের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দোকানমালিকদের অনেকেই সকালে ঘটনাস্থলে এলেও নিরাপদে সব জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পাননি। ফলে প্রকৃত ক্ষতির হিসাব পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। আগুনে পণ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দোকান ও গুদামের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। ভবনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
মনসুর খান প্লাজার এই অগ্নিকাণ্ড আবারও ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় গুদাম ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্ব সামনে এনেছে। তবে এ ঘটনায় আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ, মোট ক্ষয়ক্ষতি এবং ভবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
0 Response to "গতকালও ছিল বেচাকেনার ধুম, রাতের আগুনে ধ্বংসস্তূপ মনসুর খান প্লাজা"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন