দুর্নীতির প্রকল্প বাদ, উন্নয়নকাজে ৩ বছরের ওয়ারেন্টি! স্থানীয় সরকার নিয়ে সংসদীয় কমিটির বড় সুপারিশ

দুর্নীতির প্রকল্প বাদ, উন্নয়নকাজে ৩ বছরের ওয়ারেন্টি! স্থানীয় সরকার নিয়ে সংসদীয় কমিটির বড় সুপারিশ


 বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও দুর্নীতির উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে—এমন প্রকল্পগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। পাশাপাশি উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত এবং যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।

রোববার (১১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প যাচাই ও দুর্নীতির তদন্তের সুপারিশ

কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, বিগত সরকারের আমলে অপ্রয়োজনীয় ও দুর্নীতির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে—এমন প্রকল্প বাদ দিয়ে জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং পদায়ন নিশ্চিত করার বিষয়েও কমিটি গুরুত্বারোপ করেছে।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিগত সরকারের সময়ে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে নেওয়া অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। এসব প্রকল্প যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সড়ক নির্মাণে তিন বছরের ওয়ারেন্টির প্রস্তাব

গ্রামীণ সড়ক ও রাস্তাঘাট নির্মাণের গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি হিসেবে জামানত গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিটির সভাপতি বলেন, সড়কসহ যেকোনো উন্নয়নকাজের নির্মাণমান ঠিক রাখা এবং কাজ টেকসই করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর তিন বছর পর্যন্ত বাস্তবায়নকারী সংস্থার মেরামতের দায়িত্ব থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

কমিটির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা মানের সঙ্গে আপস করার প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি কাজের তদারকি জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে তিন বছরের ওয়ারেন্টি ও জামানতসংক্রান্ত সুপারিশ কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধি ও বাস্তবায়নপদ্ধতির বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সুপারিশ

বৈঠকে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি বলেন, সারা দেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চলছে এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ ও রোগের তীব্রতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, আগের তুলনায় মশার উপদ্রব কম বলে মনে হলেও ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করছে। কেন এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের কাজ করার কথাও জানান তিনি।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এডিস মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ নিজ এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান তদারকির সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নয়, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির মতো কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কী বলল কমিটি?

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। নির্বাচন পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা নিয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে কমিটি মনে করছে। এ কারণে কিছুটা সময় নিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে। তবে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কমিটির সভাপতি আগামী বছরের প্রথম দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে এটি কমিটির সভাপতির প্রত্যাশা; নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তফসিল বা চূড়ান্ত নির্বাচনী তারিখ হিসেবে বিষয়টি এখনই ধরে নেওয়া যাবে না।

আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ

দেশের বিভিন্ন স্থানে আর্সেনিকযুক্ত এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপদ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

নিরাপদ পানির অভাব জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই কোথায় আর্সেনিকের ঝুঁকি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে উপযুক্ত পানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, জসীম উদ্দীন আহমেদ, শেখ ফরিদ আহমেদ, সেলিনা সুলতানা, এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং রফিকুল ইসলাম খান অংশ নেন।

বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাই, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত, নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসে।

এখন নজর সুপারিশ বাস্তবায়নের দিকে

সংসদীয় কমিটির এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাছাই, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সুপারিশের পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে দুর্নীতির অভিযোগযুক্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর উন্নয়নকাজে তিন বছরের ওয়ারেন্টির প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি কতটা এগোয়, তা পর্যবেক্ষণে থাকবে সংশ্লিষ্ট মহল।

0 Response to "দুর্নীতির প্রকল্প বাদ, উন্নয়নকাজে ৩ বছরের ওয়ারেন্টি! স্থানীয় সরকার নিয়ে সংসদীয় কমিটির বড় সুপারিশ"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন