বর্ষা শেষেও ঝালকাঠিতে ডেঙ্গুর দাপট, হাসপাতালে ভর্তি ৩৪ রোগী

বর্ষা শেষেও ঝালকাঠিতে ডেঙ্গুর দাপট, হাসপাতালে ভর্তি ৩৪ রোগী


 বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও ঝালকাঠিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৪৭৩ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে জেলার চারটি সরকারি হাসপাতালে ৩৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৪ জন।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঝালকাঠির সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাব এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি শহরের কয়েকটি এলাকাকে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে কলাবাগান, বাঁশপট্টি, কাঠপট্টি, সিটি পার্ক এলাকা, ফকিরবাড়ি, স্টেশন রোড ও বান্দাঘাট। এসব এলাকায় মশার প্রজননস্থল কমাতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং জমে থাকা পানি অপসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলার চারটি সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ৯ জন, রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন, কাঠালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭ জন এবং নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে।

বর্ষা শেষ হওয়ার পরও ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকার পেছনে জমে থাকা পানিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা, খাল-নালায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং অপরিকল্পিতভাবে আবর্জনা ফেলার কারণে মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র ও পরিত্যক্ত সামগ্রীতে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে মৌসুম পরিবর্তন হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী খায়রুল ইসলাম জানান, জ্বর হওয়ার পর তিনি হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। তাঁর ভাষ্য, ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম খলিফা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু পৌরসভার মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাসাবাড়ি, সড়ক ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে মশার প্রজননস্থল কমানো সম্ভব।

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. টি এম মেহেদী হাসান সানি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র ও পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মাসুম ইফতেখার জানান, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসক জুলিয়া সুকায়না বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভার পক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শহরের প্রতিটি এলাকায় এসব কার্যক্রম কার্যকর করতে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, নির্ধারিত স্থানে আবর্জনা ফেলা এবং খাল-নালা পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে। বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান সিভিল সার্জন।

জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন জানান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি শনিবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করছে। পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে কোথাও পানি জমে মশার বংশবিস্তার না ঘটে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা, আবর্জনা অপসারণ এবং জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি। বর্ষা শেষ হলেও মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। তাই প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

0 Response to "বর্ষা শেষেও ঝালকাঠিতে ডেঙ্গুর দাপট, হাসপাতালে ভর্তি ৩৪ রোগী"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন