ঋণের চাপ সামলাতে আর্থিক সংস্কারের তাগিদ আইএমএফের, বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা

ঋণের চাপ সামলাতে আর্থিক সংস্কারের তাগিদ আইএমএফের, বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা


 বৈশ্বিক ঋণের চাপ বাড়ছে, আর্থিক সংস্কারে গুরুত্ব আইএমএফের

বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের চাপ, ঋণের সুদ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোকে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা উন্নত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এসব নীতিগত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ২০২৬-এর একটি সাইড ইভেন্টে ‘অ্যাডাপ্টিং টু আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: হাউ ইজ দ্য আইএমএফ হেল্পিং কান্ট্রিজ নেভিগেট নিউ প্রেসারস?’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সদস্যদেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী আইএমএফের নীতিগত কাঠামো আরও কার্যকর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা।

আলোচনায় অংশ নেন আইএমএফের কৌশল, নীতি ও পর্যালোচনা বিভাগের পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুমসেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর চ্যাংইয়ং রি এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাউরিসিও কার্দেনাস। প্যানেলটি সঞ্চালনা করেন রয়টার্সের বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদদাতা ডেভিড লডার।

ক্রিশ্চিয়ান মুমসেন বলেন, একের পর এক বৈশ্বিক অভিঘাতের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। নিম্ন আয়ের ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলো সংকটের কারণে তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে রয়েছে। জনমিতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ঋণের ঝুঁকি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ায় অনেক দেশের জন্য উন্নয়ন খাতে অর্থায়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইএমএফের আলোচনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কার কথাও উঠে আসে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের রাজস্ব আয়, ঋণের সুদ পরিশোধ, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন এবং সামাজিক খাতে ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক সুদহার ও ঋণের ব্যয় দীর্ঘদিন বেশি থাকলে নতুন অর্থায়ন সংগ্রহ এবং উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মুমসেন। তাঁর মতে, সংকট মোকাবিলায় সহায়তা দিতে হলে তা সাময়িক ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে তৈরি মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে উৎপাদন, পরিবহন এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখার বিষয়েও সতর্ক নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তৈরি নতুন ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন আইএমএফের এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও একাই যথেষ্ট নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, অর্থায়নের সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আলোচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা এবং ঋণের ঝুঁকি কমাতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নীতিগত পরামর্শ, অর্থায়ন, সক্ষমতা উন্নয়ন ও সংলাপের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোকে সহায়তা করাকে আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

পাশাপাশি আইএমএফের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নজরদারি, ঋণ সহায়তা কর্মসূচির নকশা ও শর্ত, আর্থিক খাত মূল্যায়ন, নিম্ন আয়ের দেশের ঋণ টেকসই থাকার কাঠামো এবং বৈদেশিক ভারসাম্য মূল্যায়ন পদ্ধতি। এসব পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা এবং দেশভেদে উপযোগী নীতিগত কাঠামো আরও কার্যকর করা।

সব মিলিয়ে, আইএমএফের আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের ঝুঁকি হ্রাস এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলায় আর্থিক সংস্কার ও নীতিগত সক্ষমতা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ

0 Response to "ঋণের চাপ সামলাতে আর্থিক সংস্কারের তাগিদ আইএমএফের, বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন