উদ্বোধনের পাঁচ মাস পরও চালু হয়নি বগুড়ার আধুনিক কসাইখানা, দুর্ভোগে এলাকাবাসী
বগুড়ায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক কসাইখানা উদ্বোধনের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাবে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে অত্যাধুনিক এই স্থাপনা। অন্যদিকে, নগরীর বিভিন্ন স্থানে খোলা জায়গায় পশু জবাই ও বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশদূষণ এবং দুর্গন্ধে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আধুনিক কসাইখানাটি চালু হলে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহ, পশুবর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, পরিচালনব্যবস্থা ও মাংস ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত না হওয়ায় এখনো কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পশুবর্জ্যের দুর্গন্ধে ভোগান্তি
বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে গোদারপাড়া বাজার এলাকায় পশুবর্জ্য ফেলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হচ্ছেন পথচারী, বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা এবং আশপাশের বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের চলাচলে সমস্যার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, পশুবর্জ্যের দুর্গন্ধে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীদের অল্প সময়ের জন্যও দুর্গন্ধ সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ স্থানীয়দের প্রতিদিন এই পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জয়পুরপাড়ায় আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা চালু হলে গোদারপাড়া এলাকার পরিবেশের উন্নতি হতে পারত। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। দ্রুত পশুবর্জ্য অপসারণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহের প্রত্যাশা
বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা শ্যামলী আক্তারের মতে, আধুনিক কসাইখানা চালু হলে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে পশু জবাইয়ের সময় সব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি মাংসের স্বাস্থ্যগত মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আধুনিক কসাইখানা চালু হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাংস প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ বাড়বে। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দ্রুত কসাইখানাটির কার্যক্রম শুরুর দাবি জানান তিনি।
তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী জানান, আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত কসাইখানাটি পরিচালনার মতো দক্ষ জনবল বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নেই। এ কারণে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্থাপনাটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কসাইখানা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে নগরীতে খোলা জায়গায় পশু জবাই ও মাংস বিক্রির যে প্রচলন রয়েছে, তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আধুনিক কসাইখানার মাধ্যমে নগরবাসীর কাছে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর মাংস পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে মুনাফার চেয়ে স্থাপনাটিকে সচল করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় নগরীর কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তাঁদের নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। মাংস পরিবহনের সমস্যা এড়াতে চিলার ভ্যানের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
কসাইখানাটি চালু হলে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি।
শরিয়তসম্মত জবাই ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা
বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আধুনিক কসাইখানায় যন্ত্রের মাধ্যমে পশু জবাই করা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। সেখানে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে পশু জবাই করা হবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হবে।
তিনি জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে পশু জবাইয়ের পর দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রেখে মাংস বিক্রি করা হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আধুনিক কসাইখানায় পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাইয়ের উপযোগিতা যাচাই এবং মাংসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও জানান, লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট (এলডিডিপি) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্থাপনাটি ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মাংস নিরাপদ কি না, তা তদারক করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
কসাইখানায় পশুর মল প্রক্রিয়াজাত করে বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি পশুবর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত স্থাপনা
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট (এলডিডিপি) প্রকল্পের আওতায় বগুড়া নগরীর জয়পুরপাড়ায় ৫০ শতক জমির ওপর আধুনিক কসাইখানাটি নির্মাণ করা হয়। গত ১৭ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এর উদ্বোধন করেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া নগরীতে প্রায় ৪৯২ জন কসাই রয়েছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কসাইখানাটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন। স্থাপনাটি চালু হলে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পশুবর্জ্যজনিত দুর্ভোগ কমাতেও সহায়তা মিলতে পারে।
0 Response to "উদ্বোধনের পাঁচ মাস পরও চালু হয়নি বগুড়ার আধুনিক কসাইখানা, দুর্ভোগে এলাকাবাসী"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন