২০২৮ সালের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা ইউজিসির

২০২৮ সালের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা ইউজিসির


 দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করতে বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষার্থীদের ভর্তি থেকে শুরু করে সনদ সংগ্রহ পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা অনলাইনে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্সে ‘উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর’ শীর্ষক পরামর্শক কর্মশালায় এসব পরিকল্পনার কথা জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

দুই বছরের মধ্যে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের লক্ষ্য

কর্মশালায় ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক, উচ্চগতির ওয়াই-ফাই এবং প্রয়োজনীয় সহায়তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ চালু করা এবং ধাপে ধাপে ক্যাম্পাসগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ জন্য শুধু ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার, তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা, সফটওয়্যার এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নও জরুরি বলে উল্লেখ করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।

ভর্তি থেকে সনদ—অনলাইনে শিক্ষার্থীদের সেবা

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা অনলাইনভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইউজিসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা যেন দূরে বসেই ভর্তির আবেদন করতে পারেন, ফি জমা দিতে পারেন এবং আবাসিক হলের আসনসংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন, সে ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন সেবা প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর সনদ সংগ্রহের জন্য শিক্ষার্থীদের যেন বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আবেদন বা ফি জমা দিতে না হয়, সে লক্ষ্যেও অনলাইন সেবা চালুর কথা জানান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।

ইউজিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব সেবা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের সময় ও যাতায়াতের চাপ কমানোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও গতি আনা সম্ভব হবে।

পাঁচ বছরের মধ্যে বাধ্যতামূলক হতে পারে ইন্টার্নশিপ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। এ লক্ষ্যে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করছে সংস্থাটি।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বিভাগ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী কতজনের ইন্টার্নশিপ প্রয়োজন, সে তথ্য জানাবে। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরগুলো কতজন শিক্ষার্থীকে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিতে পারবে, তা উল্লেখ করবে। ইউজিসি দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করবে।

এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম চালু হলে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের চাহিদা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুযোগের মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ এবং কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য শিক্ষক ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি কমাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটারবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তিনি উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে প্রযুক্তির সহায়তায় অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠদানের সুযোগ তৈরি করা। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রশাসনিক কাজে সমন্বিত সফটওয়্যার

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সহজ ও কার্যকর করতে সমন্বিত সফটওয়্যার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভর্তি, হিসাব, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী ব্যবস্থাপনা এবং বৃত্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, এমন একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম থাকা প্রয়োজন, যেখান থেকে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রার ও হিসাব বিভাগের কার্যক্রম আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে একই ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কীভাবে সমন্বয় করে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চান তিনি। তাঁর মতে, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্ক, তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা ও সফটওয়্যারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন যারা

‘উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর’ শীর্ষক পরামর্শক কর্মশালায় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব ও অধ্যাপক ড. আসলাম হোসেন এবং হিট প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান বক্তব্য দেন।

এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও গবেষক এবং ইউজিসি ও হিট প্রকল্পের কর্মকর্তারা অংশ নেন। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কর্মশালায় আলোচনা হয়।

ইউজিসির পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, সফটওয়্যারের সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।

0 Response to "২০২৮ সালের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা ইউজিসির"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন