বরিশালে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগে স্বামী-দেবর পুলিশ হেফাজতে

বরিশালে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগে স্বামী-দেবর পুলিশ হেফাজতে


 বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ঐশী আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর স্বজনেরা। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহতের স্বামী সোহেল খান (২৮) ও দেবর তানভীর খানকে (২২) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঐশীকে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুতে মাত্র ১ মাস ১০ দিনের একটি শিশুসন্তান মাকে হারিয়েছে।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন, মাথায় রক্তক্ষরণের আশঙ্কা

বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ কে মনিরুল ইসলাম জানান, ঐশীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। হাসপাতালে নেওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলেও চিকিৎসকদের ধারণা।

তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দাম্পত্য কলহের জেরে নির্যাতনের অভিযোগ

নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য কলহের জেরে ঘটনার চার দিন আগে সোহেল তাঁর স্ত্রীর মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তাঁকে মারধর করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

নিহত ঐশীর বড় বোনের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই সোহেল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঐশী নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন। সন্তান জন্মের পরও তাঁর যথাযথ চিকিৎসা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরিবারের দাবি, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঐশী স্বামীর বাড়িতে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে সোমবার সকালে তাঁকে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের বড় বোন আরও দাবি করেন, সোহেলের আগে আরেকটি বিয়ে হয়েছিল এবং সেই সংসারে তাঁর একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফল এখনো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নিহতের পরিচয় ও পারিবারিক তথ্য

ঐশী আক্তার বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর সাধুকাঠী গ্রামের শাহে আলমের মেয়ে। তাঁর স্বামী সোহেল খান কেদারপুর ইউনিয়নের ভূতেরদিয়া গ্রামের বাসিন্দা কাদের খানের ছেলে। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রি।

ঐশীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে নবজাতক শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা।

স্বামী ও দেবর পুলিশ হেফাজতে

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঐশীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাঁর স্বামী সোহেল খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাঁর দেবর তানভীর খানকেও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বাকেরগঞ্জ সার্কেল) মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দাম্পত্য কলহের জেরে ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা

ঐশীর মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ঐশীর মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাবে না।

0 Response to "বরিশালে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগে স্বামী-দেবর পুলিশ হেফাজতে"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন