এআই দিয়ে প্রতারণা বাড়ছে, নিরাপদ থাকতে যা করবেন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল তৈরি করছে অপরাধীরা। ভুয়া অনলাইন দোকান, পরিচিত মানুষের নকল কণ্ঠস্বর, বাস্তবের মতো দেখতে ভিডিও এবং ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে ওঠায় ভোক্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের সাহায্যে অল্প সময়েই পেশাদার চেহারার ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এসব সাইটে কখনো যুক্তরাজ্যের পারিবারিক ব্যবসার পরিচয় দিয়ে দেশটিতে তৈরি উন্নত মানের পণ্য বিক্রির দাবি করা হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে যুক্তরাজ্যের রাস্তা, স্থানীয় পরিবেশ কিংবা দেশটির পতাকার ছবিও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে পণ্য হাতে পান না। কখনো তাঁদের কাছে নিম্নমানের গণহারে উৎপাদিত পণ্য পাঠানো হয়।
নকল কণ্ঠস্বর ও ডিপফেক ভিডিওর ফাঁদ
ন্যাশনাল ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস প্রথমবারের মতো এআই ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে একটি সতর্কতামূলক তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, কণ্ঠস্বর নকল করার প্রযুক্তি এবং ডিপফেক ভিডিওর মতো ঝুঁকির বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
ডিপফেক হলো এআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত এমন ছবি, অডিও কিংবা ভিডিও, যার মাধ্যমে কাউকে এমন কিছু বলতে বা করতে দেখা যেতে পারে, যা বাস্তবে ঘটেনি। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বার্তা তৈরি করা হতে পারে। ফলে শুধু ছবি, কণ্ঠস্বর বা ভিডিও দেখে কারও পরিচয় নিশ্চিত করা ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতারণার আরেকটি ধরন হলো অনলাইনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে অর্থ আদায়। এ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত তথ্য মনে রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক কথোপকথনের মতো যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রতারকের তৈরি করা পরিচয়কে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।
এ ছাড়া পরিচিত আত্মীয় বা বন্ধুর কণ্ঠস্বর নকল করে জরুরি প্রয়োজনে অর্থ চাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনেই অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া উচিত নয়। অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনুরোধটির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
ভুলহীন ভাষার বার্তাও হতে পারে প্রতারণা
এআই ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য আলাদাভাবে প্রতারণামূলক ই-মেইল, খুদে বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট তৈরি করা যায়। এসব বার্তায় বানান ও ব্যাকরণগত ভুল না থাকায় সেগুলোকে সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।
ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘হুইচ’-এর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু বানান বা ব্যাকরণগত ভুল খুঁজে এখন প্রতারণামূলক বার্তা শনাক্ত করা যথেষ্ট নয়। বরং বার্তার উৎস, প্রেরকের পরিচয়, দেওয়া লিংক এবং অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার কারণ যাচাই করা প্রয়োজন।
এআই প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকার উপায়
ন্যাশনাল ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডসের পরামর্শ অনুযায়ী, যাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি, এমন কারও কাছে টাকা, উপহারের কার্ড কিংবা ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য পাঠানোর আগে সতর্ক থাকতে হবে। অনলাইন দোকান থেকে কেনাকাটার সময় ওয়েবসাইটের ঠিকানা, বিক্রেতার পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা উচিত।
চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন বা অর্থ পরিশোধের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপনটির সত্যতা নিশ্চিত করা ভালো। অচেনা লিংকে ক্লিক করা বা যাচাই না করে কোনো ওয়েবসাইটে ব্যাংকিং তথ্য দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।
পরিচিত কেউ ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে টাকা চাইলে তাঁর পরিচিত নম্বরে নিজে ফোন করে অথবা আগে থেকে জানা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করুন। ভিডিও কলে কাউকে দেখা গেলেও পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে আগে থেকে ঠিক করা গোপন প্রশ্ন বা পারিবারিক কোনো পরিচিত সংকেত ব্যবহার করা যেতে পারে।
কেউ দ্রুত টাকা পাঠাতে, ব্যক্তিগত তথ্য দিতে কিংবা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিলে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। প্রতারকেরা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে চিন্তা ও যাচাই করার সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থ পরিশোধ, ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে থামুন, তথ্য যাচাই করুন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিন। এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট যতই বাস্তব মনে হোক, স্বাধীনভাবে পরিচয় ও তথ্য যাচাই করাই প্রতারণা এড়ানোর অন্যতম কার্যকর উপায়
0 Response to "এআই দিয়ে প্রতারণা বাড়ছে, নিরাপদ থাকতে যা করবেন"
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন